ঢাকা ১২:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ঢামেকে অচেতন ব্যক্তিকে রেখে পালালেন দুই যুবক, মিলল পরিচয় স্তন ক্যান্সার সচেতনতায় কাল রাজধানীতে হবে গোলাপি শোভাযাত্রা শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে জয় দিয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু করল পাকিস্তান ইরান যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জাতীয় অপমান: সিনেটর ক্রিস মারফি হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে আপাতত অনাগ্রহী ডোনাল্ড ট্রাম্প রূপনগর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মিঠু আটক দিল্লিতে বিক্ষোভের জেরে ইন্টারনেট ও ট্রেন চলাচলে কড়া বিধিনিষেধ বিতর্ক পেছনে ফেলে মাঠে ফিরতে প্রস্তুত ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো সিলেটে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিশ্ব ডাক দিবস উদ্‌যাপন গোমস্তাপুরে আম ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা: জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বস্তি উচ্ছেদের দাবি

উপকূলের পানিতে লবণাক্ততার সঙ্গে আর্সেনিক, জীবাণু ও সিসার মারাত্মক ঝুঁকি

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:৩৪:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে বৃষ্টির পানিই একমাত্র ভরসা। খুলনার কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের কামরুল ইসলাম কিংবা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার সরস্বতী মুন্ডার মতো হাজারো মানুষ বছরের কয়েক মাস ছাদ বা টিনের চাল থেকে পাইপের মাধ্যমে ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখেন। আপাতদৃষ্টিতে পরিষ্কার মনে হওয়া এই পানিই তারা রান্নাবান্না ও পানের কাজে ব্যবহার করেন। তবে সাম্প্রতিক একাধিক জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার এই সুপেয় পানির সংকট কেবল লবণাক্ততার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিকল্প হিসেবে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি এবং সাধারণ নলকূপের পানিতেও মিশে আছে আর্সেনিক, মলজাতীয় জীবাণু ও ক্ষতিকর সিসার মারাত্মক ঝুঁকি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উপকূলের পানির মানের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং ৬ হাজার ১০৬টি পরিবারের পানির মান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত উৎসের পানিতে ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ঘরে পান করার সময় এই জীবাণুর উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশে। গবেষকদের মতে, উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, বহন ও সংরক্ষণের ত্রুটিপূর্ণ অভ্যাসের কারণে ঘরে রাখা পানিতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পায়।

একই জরিপ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের উৎসের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা (প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম বা ১০ পিপিবি) অতিক্রম করেছে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ড (প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম) অনুযায়ীও ১০ দশমিক ৭ শতাংশ উৎসের পানিতে অতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এ DNA ১০ দশমিক ৭ শতাংশ উৎসে মাঝারি এবং ৩ দশমিক ৮ শতাংশ উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা ধরা পড়েছে। নিরাপদ পানির সবকটি শর্ত—যেমন বাড়ির আঙিনায় উন্নত উৎস থাকা, যথাসময়ে পানি পাওয়া, ই কোলাইমুক্ত হওয়া এবং আর্সেনিক সহনীয় মাত্রায় থাকা—একত্রে বিবেচনা করলে খুলনা বিভাগের মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাওয়ার পানি পেয়ে থাকেন।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম মোড়ল এই আর্সেনিক দূষণের এক জীবন্ত ভুক্তভোগী। আর্সেনিকজনিত অসুস্থতায় তাঁর বাবা, মা, স্ত্রী, দাদি ও চাচাসহ পরিবারের একাধিক সদস্য মারা গেছেন। শফিকুল নিজে শরীরে আর্সেনিকের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁর হাতের তালু শক্ত হয়ে গেছে। তিনি জানান, সরকারিভাবে বিভিন্ন সময় নিরাপদ পানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে দরিদ্র মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ নলকূপ বা পুকুরের পানি ব্যবহার করছেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদও স্বীকার করেছেন যে, খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে লবণাক্ততা ও আর্সেনিক অত্যন্ত বড় সমস্যা এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সরকার নিরাপদ পানি সরবরাহে কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে লবণাক্ততার বিকল্প হিসেবে উপকূলের মানুষ যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন, তাও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্যোগে দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নে করা একটি নতুন গবেষণা গত ২২ সেপ্টেম্বর ‘এনভায়রনমেন্ট, Development অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে ১১৬টি (116) পরিবারের ওপর জরিপ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সংরক্ষিত বৃষ্টির পানিতে মলজাতীয় কলিফর্ম ও মোট কলিফর্মের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি ড্রাম, ব্যক্তিগত ট্যাংক ও আরসিসি ট্যাংকের পানিতে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৩৩ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে, যা ডব্লিউএইচও ও বাংলাদেশের নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। আরসিসি ট্যাংকের পানিতে সিসা, লোহা ও কলিফর্মের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, ছাদের সিসাযুক্ত রং, পুরোনো পাইপ এবং ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে এই দূষণ ঘটছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৫৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা পানি ফুটিয়ে বা পরিশোধন না করেই পান করে, যার ফলে তাদের ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দুই গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের পানির সংকট নিয়ে ‘ইউটিলিটিজ পলিসি’ সাময়িকীতে ২০২৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, আশাশুনি ও শ্যামনগরের ৩৯টি ইউনিয়নের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬৬ হাজার ২৩৪টি পরিবারের ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা যায়, নলকূপের পানিতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (টিডিএস) গড় পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে ১ হাজার ৭৩৩ মিলিগ্রাম এবং পুকুরে ১ হাজার ৩৩০ মিলিগ্রাম, যা বাংলাদেশের নির্ধারিত মানদণ্ড ১ হাজার মিলিগ্রামের চেয়ে অনেক বেশি। এই পাঁচ উপজেলায় বছরের গড়ে ৪ দশমিক ৬৫ মাস নির্ভরযোগ্য কোনো সুপেয় পানি পাওয়া যায় না। পাইকগাছায় এই সংকট চলে ৭ দশমিক ১৫ মাস এবং কয়রায় ২ দশমিক ৮৪ মাস। মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব খাওয়ার পানির উৎস রয়েছে। বাকি ৮০ শতাংশ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে হয় নারী ও কিশোরীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের প্রভাষক তাসনিম চৌধুরী ফাহিম বলেন, উপকূলের নারীদের এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে গড়ে অন্তত দেড় ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় এবং বছরের পর বছর ধরে এই পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি।

পানির এই তীব্র সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুদীপ বালা জানান, মার্চ থেকে মে মাসে শুষ্ক মৌসুমে হাসপাতালে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে নারীদের মধ্যে শ্বেতপ্রদরের (সাদা স্রাব) সমস্যা নিয়মিত দেখা যায়। অন্যদিকে আইসিডিডিআরবি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন মানুষের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ জানান, খাওয়ার পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার সঙ্গে এই হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে, তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন।

গবেষকেরা ৬৬৬টি কমিউনিটি নলকূপ ও ২২৪টি পুকুরের পানির লবণাক্ততাও পরীক্ষা করেন।নলকূপের পানিতে গড় মোট টিডিএস (দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ) ছিল প্রতি লিটারে ১ হাজার ৭৩৩ মিলিগ্রাম; পুকুরে ছিল ১ হাজার ৩৩০ মিলিগ্রাম।

নমুনা নেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর, পানি দুই থেকে তিন মাস সংরক্ষণের পর।.পানির মান তো খারাপই।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

উপকূলের পানিতে লবণাক্ততার সঙ্গে আর্সেনিক, জীবাণু ও সিসার মারাত্মক ঝুঁকি

আপডেট সময় : ০৩:৩৪:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে বৃষ্টির পানিই একমাত্র ভরসা। খুলনার কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের কামরুল ইসলাম কিংবা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার সরস্বতী মুন্ডার মতো হাজারো মানুষ বছরের কয়েক মাস ছাদ বা টিনের চাল থেকে পাইপের মাধ্যমে ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখেন। আপাতদৃষ্টিতে পরিষ্কার মনে হওয়া এই পানিই তারা রান্নাবান্না ও পানের কাজে ব্যবহার করেন। তবে সাম্প্রতিক একাধিক জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার এই সুপেয় পানির সংকট কেবল লবণাক্ততার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিকল্প হিসেবে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি এবং সাধারণ নলকূপের পানিতেও মিশে আছে আর্সেনিক, মলজাতীয় জীবাণু ও ক্ষতিকর সিসার মারাত্মক ঝুঁকি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উপকূলের পানির মানের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং ৬ হাজার ১০৬টি পরিবারের পানির মান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত উৎসের পানিতে ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ঘরে পান করার সময় এই জীবাণুর উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশে। গবেষকদের মতে, উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, বহন ও সংরক্ষণের ত্রুটিপূর্ণ অভ্যাসের কারণে ঘরে রাখা পানিতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পায়।

একই জরিপ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের উৎসের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা (প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম বা ১০ পিপিবি) অতিক্রম করেছে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ড (প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম) অনুযায়ীও ১০ দশমিক ৭ শতাংশ উৎসের পানিতে অতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এ DNA ১০ দশমিক ৭ শতাংশ উৎসে মাঝারি এবং ৩ দশমিক ৮ শতাংশ উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা ধরা পড়েছে। নিরাপদ পানির সবকটি শর্ত—যেমন বাড়ির আঙিনায় উন্নত উৎস থাকা, যথাসময়ে পানি পাওয়া, ই কোলাইমুক্ত হওয়া এবং আর্সেনিক সহনীয় মাত্রায় থাকা—একত্রে বিবেচনা করলে খুলনা বিভাগের মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাওয়ার পানি পেয়ে থাকেন।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম মোড়ল এই আর্সেনিক দূষণের এক জীবন্ত ভুক্তভোগী। আর্সেনিকজনিত অসুস্থতায় তাঁর বাবা, মা, স্ত্রী, দাদি ও চাচাসহ পরিবারের একাধিক সদস্য মারা গেছেন। শফিকুল নিজে শরীরে আর্সেনিকের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁর হাতের তালু শক্ত হয়ে গেছে। তিনি জানান, সরকারিভাবে বিভিন্ন সময় নিরাপদ পানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে দরিদ্র মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ নলকূপ বা পুকুরের পানি ব্যবহার করছেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদও স্বীকার করেছেন যে, খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে লবণাক্ততা ও আর্সেনিক অত্যন্ত বড় সমস্যা এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সরকার নিরাপদ পানি সরবরাহে কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে লবণাক্ততার বিকল্প হিসেবে উপকূলের মানুষ যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন, তাও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্যোগে দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নে করা একটি নতুন গবেষণা গত ২২ সেপ্টেম্বর ‘এনভায়রনমেন্ট, Development অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে ১১৬টি (116) পরিবারের ওপর জরিপ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সংরক্ষিত বৃষ্টির পানিতে মলজাতীয় কলিফর্ম ও মোট কলিফর্মের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি ড্রাম, ব্যক্তিগত ট্যাংক ও আরসিসি ট্যাংকের পানিতে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৩৩ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে, যা ডব্লিউএইচও ও বাংলাদেশের নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। আরসিসি ট্যাংকের পানিতে সিসা, লোহা ও কলিফর্মের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, ছাদের সিসাযুক্ত রং, পুরোনো পাইপ এবং ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে এই দূষণ ঘটছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৫৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা পানি ফুটিয়ে বা পরিশোধন না করেই পান করে, যার ফলে তাদের ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দুই গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের পানির সংকট নিয়ে ‘ইউটিলিটিজ পলিসি’ সাময়িকীতে ২০২৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, আশাশুনি ও শ্যামনগরের ৩৯টি ইউনিয়নের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬৬ হাজার ২৩৪টি পরিবারের ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা যায়, নলকূপের পানিতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (টিডিএস) গড় পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে ১ হাজার ৭৩৩ মিলিগ্রাম এবং পুকুরে ১ হাজার ৩৩০ মিলিগ্রাম, যা বাংলাদেশের নির্ধারিত মানদণ্ড ১ হাজার মিলিগ্রামের চেয়ে অনেক বেশি। এই পাঁচ উপজেলায় বছরের গড়ে ৪ দশমিক ৬৫ মাস নির্ভরযোগ্য কোনো সুপেয় পানি পাওয়া যায় না। পাইকগাছায় এই সংকট চলে ৭ দশমিক ১৫ মাস এবং কয়রায় ২ দশমিক ৮৪ মাস। মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব খাওয়ার পানির উৎস রয়েছে। বাকি ৮০ শতাংশ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে হয় নারী ও কিশোরীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের প্রভাষক তাসনিম চৌধুরী ফাহিম বলেন, উপকূলের নারীদের এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে গড়ে অন্তত দেড় ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় এবং বছরের পর বছর ধরে এই পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি।

পানির এই তীব্র সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুদীপ বালা জানান, মার্চ থেকে মে মাসে শুষ্ক মৌসুমে হাসপাতালে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে নারীদের মধ্যে শ্বেতপ্রদরের (সাদা স্রাব) সমস্যা নিয়মিত দেখা যায়। অন্যদিকে আইসিডিডিআরবি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন মানুষের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ জানান, খাওয়ার পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার সঙ্গে এই হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে, তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন।

গবেষকেরা ৬৬৬টি কমিউনিটি নলকূপ ও ২২৪টি পুকুরের পানির লবণাক্ততাও পরীক্ষা করেন।নলকূপের পানিতে গড় মোট টিডিএস (দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ) ছিল প্রতি লিটারে ১ হাজার ৭৩৩ মিলিগ্রাম; পুকুরে ছিল ১ হাজার ৩৩০ মিলিগ্রাম।

নমুনা নেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর, পানি দুই থেকে তিন মাস সংরক্ষণের পর।.পানির মান তো খারাপই।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo