চিকিৎসক থেকে ক্যানসার রোগী: স্তনের চাকা যেভাবে বদলে দিল জীবন
- আপডেট সময় : ১২:২৬:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

একজন চিকিৎসক যখন নিজেই সেই রোগে আক্রান্ত হন, যে রোগের চিকিৎসা তিনি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন, তখন অভিজ্ঞতাটি আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না। এটি একজন স্তন ক্যানসারজয়ীর নিজের গল্প, যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন এবং জীবনকে বোঝার ভাষা বদলে গেছে। সেই সময়টা ছিল তার জীবনের অত্যন্ত ব্যস্ত এক অধ্যায়, যখন তিনি প্লাস্টিক সার্জারির মধ্যে হ্যান্ড সার্জারি, মাইক্রোসার্জারি নাকি ব্রেস্ট সার্জারি—কোনটিতে সুপার-স্পেশালাইজড হবেন তা নিয়ে ভাবছিলেন। যদিও ব্রেস্ট সার্জারির প্রতি তার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল, তবুও তিনি হ্যান্ড সার্জারিকে নিজের বিশেষায়িত ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন।
২০১৯ সাল থেকেই তার স্তনে একটি ছোট চাকা ছিল, যেটিকে তিনি ‘নিরীহ’ ভেবে গুরুত্ব দেননি। আলট্রাসাউন্ড গাইডেড এফএনএসি রিপোর্টে ‘ফাইব্রোসিস্টিক ডিজিজ’ আসায় তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন না। ২০২০ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় একটি হ্যান্ড সার্জারি কনফারেন্সে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তা ব্যাহত হয়। দেশে ফেরার পর এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা ও মাস্ক-পিপিই সংকটের মধ্যে তার নিজের অপারেশনের পরিকল্পনাও পিছিয়ে যায়। আজ ফিরে তাকালে তিনি ভাবেন, রোগী যদি তিনি না হয়ে অন্য কেউ হতেন, তবে তিনি শুধু এফএনএসির ওপর নির্ভর না করে কোর বায়োপসি করতে বলতেন।
কোভিড-১৯ এর কঠিন সময়ে তিনজন অ্যাডভান্সড ব্রেস্ট ক্যানসার রোগীকে দেখার পর তিনি নিজের চাকাটি নিয়ে আর ঝুঁকি নিতে চাননি। কোর বায়োপসি করানোর পর প্যাথলজিস্ট বন্ধু জানান, একটি অংশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন রয়েছে। সিনিয়র প্যাথলজিস্টের রিভিউতে ক্যানসারের সম্ভাবনা উঠে আসে। এরপর আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম ও এমআরআই রিপোর্টে তার নিজের নামের পাশে ‘স্তন ক্যানসার’ লেখাটি দেখতে পান। ১০ বছর আগে বাবার স্টেজ-৩ ক্যানসার জয়ের অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছিল।
স্বামী ও সহকর্মী ব্রেস্ট সার্জনদের পরামর্শে তিনি একজন সিনিয়র সার্জিক্যাল অনকোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। অপারেশনের পর পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কথা বলতে না পারার অসহায়ত্ব তাকে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে নতুন শিক্ষা দেয়। সাত মাসের কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি শেষে তিনি ক্যানসারমুক্ত হন। এই যাত্রা তাকে রোগীর চোখ দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থাকে দেখতে শিখিয়েছে। এখন তিনি কোনো সন্দেহজনক চাকা দেখলে আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম বা এমআরআই করাতে দ্বিধা করেন না এবং কোর বায়োপসি ছাড়া সার্জারির সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি এখন মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের গুরুত্ব দেন এবং চিকিৎসার আগে রোগীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ক্যানসার তাকে শিখিয়েছে জীবনকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে না রেখে প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিতে। তিনি এখন ‘চট্টগ্রাম কল’ নামে একটি অলাভজনক, মানবিক ও বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তার মতে, ক্যানসার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র, পুরো জীবন নয়। এখন তিনি রোগীদের নীরব ভয় ও অনিশ্চয়তাকে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আরও গভীরভাবে বুঝতে পারেন।



























