ডাকসু সংগ্রহশালায় আব্দুল মালেকের ছবি: বিতর্ক ও প্রেক্ষাপট
- আপডেট সময় : ০৬:২০:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কারের পর সেখানে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংগ্রহশালায় এখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে, তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক ছবিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন সংযোজনগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ছাত্রসংঘের তৎকালীন নেতা আব্দুল মালেকের ছবি। তাঁর একটি প্রতিকৃতি এবং মৃত্যুর পরের একটি ছবি সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
ডাকসুর পক্ষ থেকে আব্দুল মালেকের ছবির নিচে দেওয়া ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শিক্ষা সেমিনারে বক্তব্য দেওয়া শেষে ফেরার পথে বিরোধীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন।’ ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ ১৪ সেপ্টেম্বর জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সামষ্টিক সহিংসতার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ইতিহাস তুলে ধরাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তাঁর দাবি, এটি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ। তবে সমসাময়িক সংবাদপত্রে আব্দুল মালেকের আহত হওয়া ও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও, তাঁকে কে বা কারা প্রাণঘাতী আঘাত করেছিল, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।
আব্দুল মালেকের মৃত্যুর ঘটনাটি ১৯৬৯ সালের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বগুড়ার মেধাবী ছাত্র মালেক ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ডাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় শিক্ষানীতি নিয়ে বিতর্কের জেরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ড. মোহাম্মদ হাননানের ‘বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস (১৮৩০-১৯৭১)’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন খসড়া শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনার সময় ছাত্রসংঘের কর্মীরা হট্টগোল শুরু করলে দুই পক্ষের মধ্যে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে সংশোধিত নীতি ১৯৭০ সালের মার্চে পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায় গৃহীত হয়। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানে তা কার্যকর করার সুযোগ হয়নি। নূর খান প্রস্তাবে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের মতো বিষয় ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি নিয়ে প্রস্তাবের অংশটি। প্রস্তাবে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামের ধারণা ও নীতির ভিত্তিতে পরিচালনার কথা বলা হয়।
দৈনিক আজাদের ১৩ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষের পর আব্দুল মালেকসহ বেশ কয়েকজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ১৫ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ বছর বয়সী মালেকের মৃত্যু হয়। তৎকালীন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মালেকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছিল এবং শেখ মুজিবুর রহমানও শোকবাণী দিয়েছিলেন। ছাত্রশিবির বর্তমানে ১৫ আগস্টকে ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে, তবে তাদের এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দায় নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিদ্যমান।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি এবং আব্দুল মালেকের ছবি যুক্ত করার বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রদর্শনী ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্শিক। এ বিষয়ে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৪ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় থাকা জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একটি ছবির সঙ্গে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের তথ্যও রাখা হয়েছে। সংগ্রহশালা সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ডাকসুর নেতাদের বক্তব্য, জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করার জন্য তাঁর ছবি রাখা হয়নি; বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ঘটনাগুলো তুলে ধরতেই ছবিগুলো রাখা হয়েছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গ্রহণ করেনি। এছাড়া ছাত্র ফেডারেশন গোলাম আযমকে অপমানের ছবি লাগিয়ে পাল্টা প্রতিবাদ জানিয়েছে।


























