ডোপ টেস্টে ‘নেগেটিভ’ আসার বৈজ্ঞানিক কারণ ও নমুনা পরীক্ষার নিয়ম
- আপডেট সময় : ১১:০৩:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি আদালতে ইয়াবা সেবনের কথা স্বীকার করলেও ডোপ টেস্টে তাঁদের ফল ‘নেগেটিভ’ বা নেতিবাচক এসেছে। ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর আসামিদের মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করায় এমন ফলাফল এসেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ঘটনাটি দেশের ডোপ টেস্ট ব্যবস্থার কার্যকারিতা, নমুনা সংগ্রহের সময় এবং পরীক্ষাগারগুলোর সীমাবদ্ধতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।
গত ২০ আগস্ট রাতে রংপুর শহরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। ২২ আগস্ট তাঁদের মরদেহ উদ্ধারের পর ২৩ আগস্ট ভোরে পুলিশ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামের দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তবে ৩০ আগস্ট তাঁদের মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পরীক্ষার প্রতিবেদনে কারও শরীরেই মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফরেনসিক বিজ্ঞানের হিসাবে এই দুই তথ্যকে সরাসরি পরস্পরবিরোধী বলা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডোপ টেস্টে নেগেটিভ আসার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনোই মাদক নেননি। উল্লেখ্য, ডোপ টেস্টে ১১৬ (116) মাদকাসক্ত পুলিশ চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (2018)-এর ২৪ ধারায় তদন্ত বা তল্লাশির প্রয়োজনে বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা করানোর বিধান রয়েছে। তবে এই ফলাফল দিয়ে ২০ আগস্ট রাতে দুই আসামি ইয়াবা সেবন করেছিলেন কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ‘জৈব নমুনায় মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বিধিমালা, ২০২৬’-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, মাদক নেওয়ার পরও যদি জৈব নমুনায় মাদকের উপাদান নির্ধারিত মাত্রার নিচে থাকে, তবে ফল নেতিবাচক বা ‘মিথ্যা নেতিবাচক’ আসতে পারে। ইয়াবার প্রধান উপাদান মেথামফেটামিন সাধারণত মূত্রে মাত্র দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। ফলে ঘটনার ১০ দিন পর নমুনা পরীক্ষা করায় মাদকের অস্তিত্ব না পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
মাদক পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের জৈব নমুনা ব্যবহার করা হয় এবং প্রতিটির কার্যকারিতা ও শনাক্তকরণের সময়সীমা ভিন্ন। রক্তে সাধারণত অধিকাংশ মাদক এক থেকে দুই দিন এবং লালায় ৫ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়, যা সাম্প্রতিক মাদক সেবন শনাক্তে কার্যকর। অন্যদিকে, চুল ও নখ দীর্ঘমেয়াদি মাদক ব্যবহারের ইতিহাস প্রকাশ করতে পারে। চুলে এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস এবং নখে তিন থেকে ছয় মাস পরও মাদকের অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব। তবে নখের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, ডোপ টেস্টের নমুনা সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। যেমন—রক্ত নেওয়ার আগে ব্যক্তিকে অন্তত ২০ মিনিট বিশ্রামে রাখতে হয় এবং ৫ থেকে ১০ মিলিলিটার রক্ত নিতে হয়। লালা সংগ্রহের অন্তত ৩০ মিনিট আগে থেকে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। চুলের ক্ষেত্রে মাথা বা শরীরের নির্ধারিত অংশ থেকে অন্তত ১০টি চুল এবং নখের ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের নখের অংশ সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া ডোপ টেস্ট সাধারণত প্রাথমিক ও নিশ্চিতকরণ—এই দুই ধাপে সম্পন্ন হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উপপরিচালক মানজুরুল ইসলাম জানান, নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো পরীক্ষাগারের সক্ষমতায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে তাঁদের ল্যাবে মূলত মূত্র ও রক্তের প্রাথমিক পরীক্ষা করা হয় এবং পজিটিভ হলে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা করা হয়। তবে চুল ও নখের পূর্ণাঙ্গ ডোপ টেস্টের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। রংপুর মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশিদুল হকও জানিয়েছেন, তাঁদের হাসপাতালেও কেবল মূত্র পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, চুলের নমুনা পরীক্ষার সুযোগ নেই।

























