জাহাজভাঙা শিল্পে এককালীন অর্থ সহায়তা যথেষ্ট নয়, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার দাবি
- আপডেট সময় : ০২:২৩:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (২২:২২): জাহাজভাঙা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা রোধে শুধুমাত্র এককালীন অর্থ সহায়তাকে একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা না করে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও মানবাধিকারকর্মীরা। একই সঙ্গে তারা দুর্ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং শিল্পমালিক থেকে শুরু করে পুরো সাপ্লাই চেইনের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও আইনগত সংস্কারের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সোমবার ‘জাহাজভাঙার মানবিক মূল্য: বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে জবাবদিহি, প্রতিকার ও পুনরাবৃত্তি রোধ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত উঠে আসে। ‘সকল প্রাণের নিরাপত্তা (সপ্রান)’ এবং ‘অল ভিক্টিমস অ্যান্ড ভেটেরান্স নেটওয়ার্ক (এভিএন)’ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বৈঠকে দুই বছর আগে এস এন করপোরেশনের ইয়ার্ডে এমটি সুবর্ণ স্বরাজ্য জাহাজে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান নিরাপত্তা চিত্র পর্যালোচনা করা হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যকার ক্ষমতার অসমতা, মামলা করতে অনীহা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা। তিনি এই খাতে রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান। নিহত হাবিবের স্ত্রী সাবিনা খাতুন বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর পাওয়া অর্থ দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি প্রশ্ন করেন, “একজন মানুষ মারা গেলে তার জীবনের মূল্য কি মাত্র ৭ লাখ টাকা?” নিহত বরকতের শাশুড়ি রোকেয়া বেগম বলেন, এককালীন অর্থের পরিবর্তে সন্তানদের জন্য নিয়মিত মাসিক সহায়তার ব্যবস্থা প্রয়োজন। নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শারমিন বেগম সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ পরিবারের জন্য নিয়মিত সহায়তার দাবি জানান। নিহত খায়রুলের বাবা কামাল শেখ তার একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহি দাবি করেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এসব দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিশন গঠিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদনগুলো কখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ লিগ্যাল Aid অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সহকারী পরিচালক মো. তৈয়্যেবুর রহমান বলেন, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক নয়; শ্রমিকের আয়, বয়স, তার ওপর পরিবারের নির্ভরশীলতা এবং ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি কর্মক্ষেত্রজনিত দুর্ঘটনা ও আঘাতের ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি, দ্রুত বিচার, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সহজলভ্য আইনি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) সহকারী মানবাধিকার কর্মকর্তা সায়মা করিম শ্যানন বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং এগুলো কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। তিনি জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকানা ও দায়বদ্ধতার শৃঙ্খলে যুক্ত সব পক্ষের জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নীতি ও প্রচার সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী বলেন, শুধু পরিবেশবান্ধব জাহাজভাঙা কারখানা হিসেবে সনদ থাকলেই শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। তিনি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং বিদ্যমান আইন ও আদালতের নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব রাখেন।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের আইনের শাসনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার বলেন, “ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিকার পেতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের জন্য সহজপ্রাপ্য আইনি সহায়তা প্রয়োজন। এসব ঘটনা পর্যালোচনা, প্রতিকারের পক্ষে ভূমিকা রাখা এবং পুনরাবৃত্তি রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ যেন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়, তা নিশ্চিত করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।”



























