তীব্র আপত্তিতে ভেস্তে গেল সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির খরচ কমানোর উদ্যোগ
- আপডেট সময় : ০৩:৩৩:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে
প্রশাসনের তীব্র আপত্তির মুখে সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার টাকা থেকে অর্ধেকে নামানোর সিদ্ধান্ত থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই সরে এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার টাকা থেকে অর্ধেকে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রশাসনের তীব্র আপত্তির মুখে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে। এ নিয়ে সরকারের ভেতরেই এখন নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক মনে করছেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু ‘অতি উৎসাহী’ কর্মকর্তা সরকারের কাছে ভালো সাজতে গিয়ে বাস্তব প্রতিক্রিয়া বিবেচনা না করেই এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
গত ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সরকারি কর্মকর্তাদের মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হয়। চিঠিতে সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে এতে সরাসরি ‘প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা’ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে গত ১৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন চিঠি দিয়ে জানায়, মাসিক গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানোর এই সিদ্ধান্ত আর কার্যকর হচ্ছে না এবং বিদ্যমান ৫০ হাজার টাকাই বহাল থাকছে।
গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমানোর চিঠির ভাষা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। কর্মকর্তারা জানান, চিঠিতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা সচিবালয় নির্দেশমালার অনুচ্ছেদ ১৫০-এর ১-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই নিয়ম অনুযায়ী, সরকারের কোনো আদেশ জ্ঞাপনকারী চিঠিতে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমন কথা উল্লেখ না করে, ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে’ লিখতে হয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নাম যুক্ত করে সিদ্ধান্তের দায় ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
৯ জুলাই শুধু রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানোর চিঠিতেই ক্ষোভ সীমাবদ্ধ ছিল না। একই দিনে অন্য একটি চিঠির মাধ্যমে উপসচিব থেকে শুরু করে তদূর্ধ্ব স্তরের কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা বন্ধের সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছিল। এছাড়া পূর্ণ বৃত্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের প্রেষণের (ডেপুটেশন) পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি দেওয়ার আরেকটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল, যা কার্যকর হলে কর্মকর্তাদের বেতন অর্ধেক হয়ে যেত। একই দিনে এসব সিদ্ধান্ত আসায় প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
এই ক্ষোভ কেবল বেসামরিক প্রশাসনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মাসিক ৫০ হাজার টাকার এই সুবিধা শুধু বেসামরিক কর্মকর্তারাই পান না। বর্তমানে বেসামরিক প্রশাসনের প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের ৪০০ জন কর্মকর্তাসহ প্রায় ৭ হাজার ২০০ কর্মকর্তা এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন। অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা পর্যালোচনা ছাড়াই অর্থ মন্ত্রণালয় এককভাবে এই স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষা ছুটি সংক্রান্ত চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে গত ১৯ জুলাই বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে শুধু একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তাকে বদলি করে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের আড়াল করার বিষয়েও প্রশাসনে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের এই ঘটনাকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তীব্র সমালোচনা করেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের চলমান আর্থিক সংকটের মধ্যে সুবিধাভোগী একশ্রেণির কর্মকর্তার অসন্তোষের মুখে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের অসহায় আত্মসমর্পণেরই বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমানে এই ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ নিরসনে অর্থ মন্ত্রণালয়কে দুটি বিকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর একটি হলো, কর্মকর্তাদের সরকারি গাড়ি, চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা দিলে বার্ষিক খরচ কত হবে; এবং দ্বিতীয়টি হলো, বিদ্যমান সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার পদ্ধতি চালু রাখা। এই দুটির মধ্যে কোনটি বেশি সাশ্রয়ী, তা মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালে মূলত দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই এই সুদমুক্ত ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা চালু করা হয়েছিল, যা সরকারি পরিবহন পুলের ওপর নির্ভরশীলতা এবং পুনরাবৃত্ত ব্যয় কমিয়েছিল।



























