দক্ষতার অভাবে কর্মসংস্থানের সংকটে দেশের শিক্ষিত তরুণরা
- আপডেট সময় : ০৪:৫১:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। একদিকে যেমন কাজের সুযোগের অভাব রয়েছে, অন্যদিকে যেটুকু সুযোগ তৈরি হচ্ছে তার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় বিদেশেও বিপুল সংখ্যক স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী পাঠানোর ফলে তারা উঁচুমানের বেতন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর ৭৬ শতাংশই তরুণ, যার মধ্যে উচ্চশিক্ষিতদের একটি বড় অংশকে দীর্ঘ সময় চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী, যার সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ প্রতি তিনজন স্নাতক ডিগ্রিধারীর একজন বেকার। বিবিএস-এর তথ্য বলছে, ২৭ শতাংশেরও বেশি বেকার যুবককে চাকরি পেতে এক থেকে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়, যেখানে ৮ শতাংশের বেশি বেকারকে কাজ খুঁজতে হয় দুই বছরেরও বেশি সময়। উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে এই অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ; প্রায় প্রতি তিনজনের একজনকে চাকরির জন্য এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার তীব্রতা যে কতটা বেড়েছে, তা বিআইডিএস-এর গবেষণায় স্পষ্ট। বর্তমানে বিডিজবস ডটকমে ৫০ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীর প্রোফাইল রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লাখ প্রার্থী সেখানে চাকরির সন্ধানে ঢোকেন। দুই বছর আগে এই সংখ্যা ছিল দেড় লাখ, অর্থাৎ চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা ৩৩ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি প্রার্থী আবেদন করছেন, যা কোভিড মহামারির আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেশি। বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী জানান, শুধুমাত্র ঋণ সুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়, কারণ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হারে বাড়ছে।
বিদেশের শ্রমবাজারেও দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মাত্র ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী। বাকি ৭৪ শতাংশই স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ। ২০২৪ সালে দক্ষ কর্মীর হার ছিল ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ পেশাজীবী ও ২৪ শতাংশ দক্ষ কর্মী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর কারণেই সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের আয় আশানুরূপ বাড়ছে না।
দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি বিপুল অর্থ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিগত সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া হলেও তা টেকসই কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে প্রকল্পের দুর্বল পরিকল্পনা ও ভুল লক্ষ্য নির্ধারণের চিত্র ফুটে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রকল্পে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া ড্রাইভিং শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ সংশ্লিষ্ট পেশায় যুক্ত হতে পেরেছেন। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ, ঋণ সুবিধা ও নেটওয়ার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকলে এমন উদ্যোগ কেবল সার্টিফিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।




























