চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদিতে ৫৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
- আপডেট সময় : ০৪:০৬:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে

সৌদি আরবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশিই বিদেশি নাগরিক। বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০৮ জনের মধ্যে ৫৯ জনই ছিলেন বিদেশি নাগরিক, যা মোট সাজাপ্রাপ্তদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। বাকি ৪৯ জন ছিলেন সৌদি নাগরিক, যা মোট সংখ্যার ৪৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৭টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলো—ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তান। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও বৈশ্বিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে, যা আগের যেকোনো শাসনামলের চেয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বছরের প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া সাজাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের মামলা। নথিবদ্ধ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৭১টিই মাদক অপরাধে কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সাজার প্রায় ৬৬ শতাংশ (৬৫.৭%)। এর মধ্যে ৪৯ জন বিদেশি নাগরিককে মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা মোট সাজার ৪৫.৩ শতাংশ। মাদক মামলায় সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্তদের বড় অংশই ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিক। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের মামলায় ২৫টি (২৩%), রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯টি (৮.৩%) এবং অন্যান্য মামলায় ৩টি (৩%) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টিই (৭৬.৮%) ছিল অ-হত্যাকাণ্ড জাতীয় অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া বিচারকদের একক বিবেচনামূলক ক্ষমতা বা ‘তাজির’ শাস্তির ভিত্তিতে ৮৪টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা মোট সাজার ৭৭.৭ শতাংশ। আবার কার্যকর হওয়া ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টির ক্ষেত্র সম্পর্কেই (৮৪.২%) বাস্তবায়নের আগে ইএসওএইচআর বা অন্য কোনো সংস্থা তথ্য জানতে পারেনি। এতে সৌদি বিচার ব্যবস্থায় তথ্য গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার চরম অভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বেশ কিছু নির্দিষ্ট মামলার উল্লেখ করা হয়েছে। গত জুনে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটি, যাঁর আটকাদেশকে জাতিসংঘের অহেতুক আটকসংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ আগে বেআইনি আখ্যা দিয়েছিল। এছাড়া গত ৯ এপ্রিল আলী আল-সুবাইতি নামে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যার বিরুদ্ধে মাত্র ১২ বছর বয়সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। শৈশবে করা কথিত অপরাধের দায়ে এখনো অন্তত পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন। পাশাপাশি স্রেফ শান্তিপূর্ণ মতামত প্রকাশের দায়ে শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালেকি সহ আরও ৪৯ জন বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি, যাদের বিচার ২০১৮ সাল থেকে অমীমাংসিত রয়েছে।
বর্তমানে সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বিপুলসংখ্যক বিদেশি মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গুনছেন। এর মধ্যে খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে ৫ জন ইথিওপীয় ও ৫ জন সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে ৮ জন মিসরীয় বন্দি রয়েছেন। বন্দিরা জানিয়েছেন, তাঁরা পেশাদার দোভাষী বা আইনি সহায়তা পান না এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ থেকে বঞ্চিত। প্রায়ই তাঁদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রেখে হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
জার্মানির বার্লিনে সদর দপ্তর এবং যুক্তরাজ্য ও লেবাননে শাখা থাকা সংস্থাটি জানায়, অতিসম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা প্রথম ছয় মাসের মূল হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। ওই সময়কালে ঠিক কতজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তা জানা যায়নি। নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন ও শিশু অধিকার সনদসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার উপেক্ষা করে সৌদি আরব বিচারিক প্রক্রিয়ার নীতি লঙ্ঘন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অব্যাহত রেখেছে।




























