ভুল হিসাব-নিকাশে ইয়েমেনের যুদ্ধে নতুন করে জড়িয়ে পড়লো সৌদি আরব
- আপডেট সময় : ১২:৫৫:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে তেল নির্ভরতা কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। বিশ্বমানের বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন খাতের বিকাশ এবং বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর আয়োজনের মতো নানা উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে একাধিক সামরিক ও রাজনৈতিক ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে রিয়াদ আবারও ইয়েমেনের বিধ্বংসী যুদ্ধক্ষেত্রে গভীর জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর এবং তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা প্রিন্স সালমানের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
সংঘাতের এই নতুন মোড়ের নেপথ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) যৌথ জোট থেকে সরে যাওয়া। গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত বাহিনীর একটি গাড়িবহরে সৌদি সামরিক বিমান হামলা চালায়। এই ঘটনার জের ধরে দীর্ঘ এক দশকের যৌথ সামরিক জোটে বড় ধরণের ফাটল ধরে এবং আবুধাবি সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে আকস্মিকভাবে সৌদি আরবকে একাই ইয়েমেন যুদ্ধের মাঠে মুখোমুখি হতে হয়। আমিরাতের এই প্রস্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধাক্কা দেয়। পরবর্তীতে মাঠে থাকা যোদ্ধারা জানান, আমিরাতি বাহিনীর সুশৃঙ্খল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে যে রণকৌশল বজায় ছিল, সৌদি আরব তা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় হাজার হাজার যোদ্ধা দিশেহারা হয়ে পড়েন।
আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের মাত্র আট সপ্তাহ পর ইয়েমেন সংঘাত আরও মারাত্মক রূপ নেয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা চালায় এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এ সময়টি ছিল সৌদির জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। গত জুলাই মাসে খামেনির জানাজায় অংশ নিতে যাওয়া হুতি প্রতিনিধিদের বহনকারী একটি যাত্রীবাহী বিমানের অবতরণ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হুতিরা বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয়। তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত অংশ দখল করার পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে বিধ্বংসী আক্রমণ শুরু করে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি এ বিষয়ে জানান, হুতিদের এই সর্বাত্মক সামরিক আক্রমণের জন্য রিয়াদ মোটেও প্রস্তুত ছিল না এবং মাঠ পর্যায়ের মিত্রদের সঙ্গেও তাদের সমন্বয়ের বড় ঘাটতি ফুটে ওঠে।
সৌদি আরবের জন্য অপর একটি বড় ভুল হিসাব ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাদের অতিরিক্ত নির্ভরতা। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালয়’ মর্যাদা লাভ এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সৌদি সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা শিথিল হয়ে পড়ে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান গত মাসে দুই দফায় ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে হুতিদের ওপর হামলার অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। উল্টো যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের লোহিত সাগরের জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ওমানে হুতিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে। এ প্রসঙ্গে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি জানান, সৌদি সামরিক বাহিনী কখনো এককভাবে এত বড় যুদ্ধ লড়ার মতো উপযোগী করে গড়ে ওঠেনি। আগে সংকটকালে মার্কিন সহায়তার নির্ধারিত প্রক্রিয়া থাকলেও বর্তমানে সবকিছু নির্ভর করছে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির ওপর, যা সৌদি আরবকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ মিত্রদের নিয়ে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সক্রিয় করার প্রয়াস চালাচ্ছে। বর্তমানে বৃটেন মাঝআকাশে সৌদি যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সহায়তা দিচ্ছে এবং শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছেন। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এসব বাহ্যিক সহায়তা কিংবা সাময়িক কোনো অগ্রগতি এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত থামানোর জন্য যথেষ্ট নয়। মাঠে লড়াইরত দলগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূর করে একক কমান্ড প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এবং টেকসই আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমাধান না আসলে ইয়েমেনের এই কঠিন বাস্তবতা থেকে সৌদি আরবের সহজে বের হওয়ার সুযোগ নেই।





























