দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন: পুতিনের সুরক্ষায় ‘চলন্ত বাঙ্কার’ ও ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’
- আপডেট সময় : ১১:৪৬:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শনিবার থেকে দিল্লির ভারত মণ্ডপমে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি পুতিনের উপস্থিতি এবং তার জন্য নেওয়া নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর এই নেতার সুরক্ষায় কূটনৈতিক দলের পাশাপাশি রয়েছে এক বিশাল ও অত্যাধুনিক নিরাপত্তা বহর।
পুতিনের গতিবিধি ও শারীরিক অবস্থার কোনো তথ্য যাতে বিদেশি শক্তির হাতে না পৌঁছায়, সেজন্য সদা তৎপর থাকেন তার রক্ষীরা। ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশ সফরে পুতিনের নিরাপত্তা মূলত চার স্তরে বিভক্ত থাকে। প্রথম স্তরে থাকেন তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা, যারা কালো পোশাকে ইয়ারফোন কানে গুঁজে প্রেসিডেন্টের একদম কাছে অবস্থান করেন। দ্বিতীয় স্তরে নিয়োজিত থাকেন অত্যন্ত গোপন গোয়েন্দারা, যারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকেন। তৃতীয় স্তরটি বাইরের কোনো ব্যক্তিকে পুতিনের কাছাকাছি আসতে বাধা দেয় এবং পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। আর চতুর্থ তথা সবচেয়ে বাইরের স্তরে থাকেন স্নাইপাররা, যারা আশপাশের উঁচু ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়ে নজরদারি চালান।
পুতিনের সুরক্ষার দায়িত্বে রয়েছে ‘রাশিয়ান প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিস’ বা এসবিপি নামক একটি বিশেষ বাহিনী। এটি রাশিয়ার ফেডারেল প্রোটেক্টিভ সার্ভিস (এফএসও)-এর অংশ, যেখানে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী নিয়োজিত আছেন। এই সংখ্যা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুরক্ষায় নিয়োজিত সিক্রেট সার্ভিসের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি। পুতিনকে সবসময় ৩০ জন সশস্ত্র রক্ষী ঘিরে রাখেন এবং তাদের বাইরে শত শত এফএসও এজেন্ট সাধারণ মানুষের বেশে ছড়িয়ে থাকেন।
পুতিনের এই ভারত সফরকে কেন্দ্র করে রুশ ও ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যৌথভাবে একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। এর সবচেয়ে ভেতরের স্তরে রয়েছে রাশিয়ার এসবিপির সদস্যরা, যারা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে পুতিনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছেন ভারতের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি) কমান্ডোরা, যারা যেকোনো সন্ত্রাসী হামলা বা বড় হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত। আর সবচেয়ে বাইরের স্তরের দায়িত্বে রয়েছে দিল্লি পুলিশ। তারা পুতিনের যাতায়াতের রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে কড়া নজরদারি রাখছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ড্রোন, জ্যামার, এআই-ভিত্তিক নজরদারি এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির পাশাপাশি পুতিনের যাত্রাপথের উঁচু ভবনগুলোতে স্নাইপার মোতায়েন করা হয়েছে।
সড়কপথে পুতিনের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে তার বিশেষ লিমুজিন গাড়ি ‘অরাস সেনাট’, যাকে বলা হয় ‘চলন্ত বাঙ্কার’। এই বুলেট ও বোমা নিরোধক গাড়িটিতে রয়েছে জরুরি অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, রান-ফ্ল্যাট টায়ার, একটি সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পালানোর একাধিক পথ। এর উন্নত বায়ু পরিশোধন ব্যবস্থা রাসায়নিক ও জৈবিক হামলা থেকেও পুতিনকে রক্ষা করতে সক্ষম। এমনকি টায়ার বা জানলা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই গাড়ির ইঞ্জিন সচল থাকে।
আকাশপথে ভ্রমণের জন্য পুতিনের পছন্দ ‘ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ’ বিমান, যা রুশ গণমাধ্যমে ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’ নামে পরিচিত। ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এনক্রিপ্টেড কনফারেন্স রুম এবং বিশেষ কমান্ড সিস্টেম দিয়ে সজ্জিত এই বিমান থেকে প্রয়োজনে পারমাণবিক হামলার নির্দেশও দেওয়া সম্ভব। শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পুতিন যখনই ভ্রমণ করেন, একই রুটে আরও এক বা দুটি সহায়তাকারী বিমান পাঠানো হয়, যাতে তিনি কোনটিতে আছেন তা নিশ্চিত হওয়া না যায়।
পুতিনের খাদ্য ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তাও বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত। সফরের সময় হোটেলের রান্নাঘরের খাবার তিনি স্পর্শও করেন না। তার সঙ্গে থাকা নিজস্ব রুশ রাঁধুনিরা বিশেষ দস্তানা পরে তার খাবার তৈরি করেন। এই রাঁধুনিদের দিনে কয়েকবার পোশাক বদলাতে হয় এবং তাদের হাতে কোনো ক্ষত আছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি উপাদান পরীক্ষার পর খাবারটি পুতিনের টেবিলে যাওয়ার আগে তার দেহরক্ষীরা তা চেখে দেখেন।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পুতিনের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখতে তার মলমূত্র সংগ্রহের জন্য দেহরক্ষীরা সবসময় একটি স্যুটকেস সাথে রাখেন। বিদেশ সফরে পুতিনের মলমূত্র সংগ্রহ করে তা মস্কোতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া, পুতিনের সঙ্গে সবসময় থাকে রাশিয়ার পারমাণবিক কমান্ড ব্রিফকেস ‘চেগেট’। এটি রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ এবং যেকোনো জরুরি মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের নির্দেশে পারমাণবিক হামলা সচল করতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ১৯আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৩৩




























