সৌদির প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক—উভয় সংকটে পাকিস্তান
- আপডেট সময় : ১০:০১:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ৫০। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে যাওয়ার দাবির পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে আলাদাভাবে ফোনালাপ করেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে এই ফোনালাপগুলো অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে মঙ্গলবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি অনুযায়ী, হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের চারটি শহরে ৭৩ জন আহত হন এবং বেশ কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। বৃহস্পতিবার ভোরে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা ইয়েমেনের উপকূলীয় শহর মোখায় পৌঁছে দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালায়। শুক্রবার সকালে হুথিরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইয়েমেনি সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, হুথিরা বাব-এল-মান্দেবে প্রণালির উপকূলীয় ধুবাবে পৌঁছেছে এবং সরকারি বাহিনীর সরে যাওয়ার পর প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোতেও তাদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
এই সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সৌদি আরবের দুটি প্রধান তেল রপ্তানি পথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব-এল-মানদেব—একই সময়ে চাপের মুখে পড়ায় বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার স্যাটেলাইট ছবিতে সৌদি আরবের প্রধান হরমুজ-বিকল্প তেল পরিবহনপথ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের’ একটি অংশে আগুন দেখা গেছে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়, যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ চলতি সপ্তাহে সতর্ক করেছিলেন যে, হুথিদের হামলা সৌদি ভূখণ্ডে আরও ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করা হতে পারে। তবে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের তেহরানে ফোনালাপের পর বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান কি সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, নাকি কূটনীতিকেই সমাধান হিসেবে বেছে নিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান সৌদি আরব কর্তৃক ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বার্তা পাঠানোর খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইয়েমেনে হামলা চালানোর অনুরোধ পাওয়ার খবরকেও ‘কাল্পনিক’ বলে নাকচ করেছেন।
ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট জওহর সেলিমের মতে, পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থান উত্তেজনা প্রশমন ও নিরুৎসাহিতকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। গত এপ্রিলে সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণা করার পরও পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। ইয়েমেন ইস্যুতে ২০১৫ সালেও পাকিস্তান একই ধরনের দ্বিধার মুখে পড়েছিল, যখন পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে সৌদি আরবের সেনা সহায়তা অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইরানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়ার দাবি, হুথিদের ওপর ইরানের প্রভাব থাকলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণমূলক নয়। তবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা হুথিদের এই অগ্রগতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ এবং সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার হুথিদের এই বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে একে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদিকে সৌদি আরবের কিং ফয়সাল সেন্টারের বিশ্লেষক উমর করিম মনে করেন, নিষ্ক্রিয় থাকার রাজনৈতিক মূল্য বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণে পাকিস্তানকে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।




























