গাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের গোপন কৌশল ফাঁস করল প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’
- আপডেট সময় : ০২:৫৪:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের বিভিন্ন গোপন ও ভয়ঙ্কর পদ্ধতি উন্মোচিত হয়েছে একটি নতুন প্রামাণ্যচিত্রে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ২৪ জন সদস্যের দেওয়া জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ‘নাজা’ (এনএজেডএ) নামের এই প্রামাণ্যচিত্রটি। অস্কারজয়ী ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোরের পরিচালনায় ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কারের লড়াইয়ে থাকা একমাত্র প্রামাণ্যচিত্র এটি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রযোজিত এই প্রামাণ্যচিত্রটির নাম রাখা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সংক্ষেপিত শব্দ থেকে, যা তারা হামলায় সম্ভাব্য নিহত সাধারণ নাগরিকদের বোঝাতে পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ছবিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনারা ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি এবং দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যুদ্ধের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকি এড়াতে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। রাজধানী তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে রাতে নেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোতে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁদের চেহারা ও কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকারদাতাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা। এর মাধ্যমে হামাসের তুলনামূলক নিচু স্তরের বিপুলসংখ্যক সদস্যকে চিহ্নিত করা হতো এবং পরিবারের সদস্যরাও মারা যাবেন জেনেও রাতের বেলা তাঁদের বাড়িঘরে বোমা হামলা চালানো হতো। এমনকি নিশানা করা ব্যক্তিদের ফোন হ্যাক করে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথন গোপনে শোনা হতো এবং সপরিবার হত্যার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত এই নজরদারি চলত। এছাড়া ইসরায়েলি বাহিনীর নিজস্ব হিসাবেই প্রায় ২৫ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের ঘরে আছেন নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও পুরো এলাকা ধ্বংস করা, সুপরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার মতো প্রত্যক্ষ বিবরণও এতে উঠে এসেছে।
প্রামাণ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন এমন এক গোপন গোয়েন্দা ইউনিটে কর্মরত ছিলেন, যা সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে তথ্য পাঠাত। এই ইউনিটের এক সদস্য জানান, তাঁদের মূল লক্ষ্যই ছিল ‘শান্তি বিনষ্ট করা’। ছবিটির যৌথ বিবৃতিতে পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর বলেন, "আমাদের দেশ যে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচার হত্যার জন্য দায়ী, তার নেপথ্যের কলকাঠি ও ব্যবস্থাগুলো খতিয়ে দেখার একটি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা ছবিটি তৈরি করেছি। ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অবস্থানের জায়গা থেকে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি।" তাঁরা জোর দিয়ে বলেন, কোনো বিচ্ছিন্ন সেনা সদস্যের যুদ্ধাপরাধ নয়, বরং পুরো অবিচারমূলক সামরিক নীতি ও ব্যবস্থাকে উন্মোচন করাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য।
প্রামাণ্যচিত্রটির সহপ্রযোজক হিসেবে ছিলেন জেমস উইলসন এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন জোনাথন গ্লেজার ও দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী বিভাগের প্রধান পল লুইস। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি প্রকাশনা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’, হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘লোকাল কল’ এবং দ্য গার্ডিয়ানের প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি হয়েছে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবার্তো বারবেরা ছবিটিকে রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও অত্যন্ত চমৎকার কাজ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার দিতে রাজি করাতে তিন বছর সময় লেগেছে এবং তাঁদের জবানবন্দি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো।
এর আগে ২০২৫ সালে সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে অস্কারজয়ী ‘নো আদার ল্যান্ড’ ছবির চার সহপরিচালকের দুজন ছিলেন আব্রাহাম ও জোর। সেখানে তাঁরা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। পরিচালকদের মতে, ‘নাজা’ প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা এমন এক সামরিক ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন, যাকে জাতিসংঘের কমিশন ও বিশ্বের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যা গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি। ইসরায়েলি বিধিনিষেধে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ এবং তিন-চতুর্থাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ায় বর্তমানে গাজার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনহীন তাঁবুর শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।



























