যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে যেভাবে টিকে আছে তিন কিমের উত্তর কোরিয়া
- আপডেট সময় : ০৬:০৪:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৭৮ বছরে উত্তর কোরিয়াকে পাড়ি দিতে হয়েছে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দীর্ঘ আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মতো চরম প্রতিকূল পথ। এই দীর্ঘ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে, পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিলোপ হয়েছে এবং চীনও হেঁটেছে মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো রয়ে গেছে প্রায় অপরিবর্তিত। কিম ইল-সুং থেকে শুরু করে তাঁর ছেলে কিম জং-ইল এবং বর্তমানে নাতি কিম জং-উনের হাত ধরে তিন প্রজন্ম ধরে দেশটির ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে একটি পরিবারই। কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক অস্ত্র এবং চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত সমর্থন দেশটিকে এই দীর্ঘ সময় টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে।
১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরীয় উপদ্বীপ ছিল জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর ৩৮তম অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়াকে সাময়িকভাবে বিভক্ত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। এই বিভাজনের সূত্র ধরে ১৯৪৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উত্তরে সোভিয়েত-সমর্থিত কিম ইল-সুং এবং দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সিংম্যান রি ক্ষমতায় আসেন। দুই পক্ষই নিজেদের পুরো উপদ্বীপের বৈধ সরকার দাবি করলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালের জুনে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণে আক্রমণ চালালে শুরু হয় কোরীয় যুদ্ধ। চীনের সহায়তায় উত্তর কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়া এই যুদ্ধে অংশ নেয়। ১৯৫৩ সালে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে লড়াই থামলেও কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি না হওয়ায় উপদ্বীপের স্থায়ী বিভাজন রয়ে যায়।
উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুং ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত একদলীয় ও চরম কেন্দ্রীভূত শাসন পরিচালনা করেন। তিনি ‘জুচে’ বা স্বনির্ভরতার রাজনৈতিক তত্ত্ব সামনে এনেছিলেন, যার মূল কথা ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষায় নিজস্ব পথ অনুসরণ করা। তবে বাস্তবে দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সহায়তার ওপরই নির্ভরশীল ছিল। কিম ইল-সুংয়ের শাসনামলে তাঁকে ঘিরে এক তীব্র ব্যক্তিপূজা গড়ে তোলা হয়, যা কিম পরিবারের শাসনকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করে। নিজের জীবদ্দশাতেই তিনি ছেলে কিম জং-ইলকে উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলেন, যার ফলে ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো দেশটিতে বংশানুক্রমিক ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে।
কিম জং-ইল এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেন যখন ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উত্তর কোরিয়া তার প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারকে হারিয়ে তীব্র সংকটে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশটিতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে এবং লাখ লাখ মানুষ খাদ্যের খোঁজে সীমান্ত পেরিয়ে চীনে পালিয়ে যায়। এই মানবিক বিপর্যয়ের মুখে কিম জং-ইল ‘সামরিক বাহিনী প্রথম’ (সংগুন) নীতি গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ বণ্টনে সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যা কিম পরিবারের শাসন টিকিয়ে রাখার মূল হাতিয়ারে পরিণত হয়।
কিম জং-ইলের আমলেই উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের পথে দ্রুত অগ্রসর হয়। ২০০৩ সালে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যায় এবং ২০০৬ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এর জেরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও এই পারমাণবিক কর্মসূচিই পিয়ংইয়ংয়ের জন্য বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকানোর সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি হয়ে ওঠে।
২০১১ সালের ডিসেম্বরে কিম জং-ইলের মৃত্যুর পর তরুণ ও অনভিজ্ঞ কিম জং-উন ক্ষমতায় আসেন। শুরুতে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় থাকলেও দ্রুতই তিনি দল, সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অধীনেই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অভাবনীয় গতি পায়। ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়া যে ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে, তার মধ্যে চারটিই হয়েছে কিম জং-উনের আমলে। ২০১৮ সালে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠকে বসে কূটনীতির পথ ধরেন। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে মতবিরোধের কারণে ২০১৯ সালের হ্যানয় সম্মেলন কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। ২০২২ সালে উত্তর কোরিয়া নতুন পারমাণবিক নীতি আইন পাস করে, যা কিম জং-উনকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একক কর্তৃত্ব দেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিম জং-উন নিজের ক্ষমতাকে আরও নিরঙ্কুশ করেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির নবম কংগ্রেসে দলের নিয়মে বড় পরিবর্তন আনা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন নিয়মে কিম জং-উনকে কর্মকর্তা নিয়োগ, অপসারণ ও বিভাগ ভেঙে দেওয়ার স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এমনকি এই নতুন নিয়মে তাঁর পূর্বসূরি কিম ইল-সুং ও কিম জং-ইলের কাজের উল্লেখ বাদ দিয়ে কেবল কিম জং-উনের ভূমিকাকেই সামনে আনা হয়েছে, যাকে বিশ্লেষকেরা ‘কিম জং-উন যুগ ২.০’ বলে অভিহিত করেছেন।
উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো তথ্যের ওপর চরম নিয়ন্ত্রণ। দেশটিতে কোনো স্বাধীন গণমাধ্যম নেই এবং বিদেশি বিনোদন বা খবরের ওপর রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বরং নজরদারি, বাধ্যতামূলক শ্রম ও কঠোর শাস্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি বিদেশি টিভি অনুষ্ঠান প্রচারের মতো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ৩০০ জনের বেশি প্রত্যক্ষদর্শী ও দলছুট ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদন অবশ্য উত্তর কোরিয়া বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
বর্তমানেও উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের জীবন অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্যমতে, দেশটির ১ কোটি ৭ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি পাঁচ শিশুর একজন স্টান্টিং বা স্বাভাবিক বৃদ্ধিহীনতার শিকার। তবে এর মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অস্ত্র বিক্রির সুবাদে দেশটির অর্থনীতিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ৩.৫ শতাংশ বেড়েছে, যা টানা তিন বছর ৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা।
দীর্ঘদিন ধরে চীনের ওপর উত্তর কোরিয়ার একক নির্ভরতা থাকলেও (২০২৫ সালে যা ছিল মোট বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ), ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সেনা সরবরাহ করেছে, যার বিনিময়ে তারা মস্কো থেকে পাচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামরিক-প্রযুক্তিগত সহায়তা। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে প্রথম সড়কসেতুও চালু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া চীনের ওপর তার একক নির্ভরতা কমাতে চাইছে।
দেশটির ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কিম জং-উনকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। সি চিন পিং তাঁর বার্তায় বলেছেন, "উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা চীনের ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের অবিচল নীতি।" অন্যদিকে পুতিন দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে একই সময়ে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া তার ইয়ংবিয়ন পারমাণবিক কেন্দ্রে একটি নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি করেছে, যেখানে ২৮টি সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড রাখার জায়গা রয়েছে, যা দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলারই ইঙ্গিত দেয়।




























