নেপালে সুড়ঙ্গে ৯ দিন মাটিচাপা পড়েও যেভাবে বেঁচে ফিরলেন দুই কর্মী
- আপডেট সময় : ০৫:৪০:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

ঘুটঘুটে অন্ধকার আর চারপাশে কাদাপানির মধ্যে কখনো জ্ঞান হারিয়ে, আবার কখনো ক্ষীণ চেতনা ফিরে পেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন কবির মহরজন। নেপালে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া একটি সুড়ঙ্গে আটকে ছিলেন তিনি। টানা ৯ দিন যমদূতের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে যখন অলৌকিকভাবে উদ্ধার পেয়ে হাসপাতালে চেতনা ফিরল, তখন কবির নিজের স্ত্রীকেও চিনতে পারছিলেন না। বিভ্রান্ত অবস্থায় তিনি শুধু জানতে চাচ্ছিলেন, এতক্ষণ কেন তাঁকে একটি বিছানা দেওয়া হয়নি।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ওপর লাংটাং লিরুং পর্বতের একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট শক্তিশালী ভূমিধসে কাদা ও পানির বিশাল ঢল নেমে আসে ভাটির দিকে। এতে চাপা পড়ে যায় ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক, যেখানে প্রায় ৯০০ কর্মী আটকা পড়েন। এই ভয়াবহ দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতজুড়ে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। আপার ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত কবির মহরজনের সঙ্গে ওই সুড়ঙ্গের একটি কক্ষে আটকা পড়েছিলেন যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ। কক্ষটিতে বাতাস থাকায় তাঁরা অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান বলে জানিয়েছেন উদ্ধার তৎপরতার নেতৃত্বে থাকা অভিজ্ঞ টানেল প্রকৌশলী ও আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে।
দুর্যোগের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় (জিএমটি ০১:৪৫) কাজে যাওয়ার আগে স্ত্রী হীরা শোভাকে ফোন করেছিলেন কবির মহরজন। তিনি বলেছিলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে যাচ্ছেন এবং সেখানে কোনো নেটওয়ার্ক থাকবে না। এর মাত্র ঘণ্টাখানেক পরই ২৫ মাইল উজানে হিমবাহ ধসের ঘটনাটি ঘটে। রাজধানী কাঠমান্ডুতে বসে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা যখন মনিটরে প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন হঠাৎ করেই স্ক্রিনের একের পর এক স্টেশন অদৃশ্য হতে শুরু করে। শুরুতে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী সুরজ দহল পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বন্যা মনে করলেও দ্রুতই বুঝতে পারেন পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ত্রিশূলী-৩ প্রকল্পের স্টেশন ম্যানেজার বিদেশে থাকায় সুড়ঙ্গের ভেতরের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কর্মকর্তাদের কিছুটা সময় লেগে যায়। ততক্ষণে উজানের দুটি প্রকল্পে ঢল আঘাত হেনেছিল।
সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে হীরা শোভা স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এর ঠিক দুই মিনিট পর কর্মকর্তারা ৩-এ প্রকল্পে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন, ‘সরে যান!’ পাওয়ার হাউসে কর্মরত সঞ্জয় শাহ তখন দ্রুত এক তলা থেকে অন্য তলায় ছুটে গিয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করতে থাকেন। সুড়ঙ্গের বাইরে থাকা শ্রমিকেরা আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও পানির তীব্র গতির কাছে পরাস্ত হন। কর্মকর্তারা জানান, ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে প্রায় ৩০ জন শ্রমিককে তাঁদের উচ্চতার চেয়ে বহুগুণ উঁচু ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার একটি মইয়ের সন্ধান পান। প্রকৌশলী সুরজ দহলের মতে, কর্মীরা যদি এই মইটির কথা আগে জানতেন, তবে সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।
প্রকৌশল নকশা অনুযায়ী, সুড়ঙ্গটির চারটি প্রবেশপথের একটি ১৮০ মিটারেরও বেশি দীর্ঘ হয়ে ভূগর্ভস্থ পাওয়ার হাউসে গিয়ে পৌঁছেছে। প্রথমে উদ্ধারকারীরা ভেবেছিলেন পুরো সুড়ঙ্গটি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং সেখানে কেউ বেঁচে নেই। তবে টানেল প্রকৌশলী শ্রী রাম নেউপানে তুলনামূলক ছোট একটি কেবল ডাক্ট সুড়ঙ্গের দিকে নজর দেন, যা ঢালু হয়ে ওপরে উঠে যাওয়ায় পানি কম ছিল। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে ১৬০ মিটার দূরে একেবারে শেষ প্রান্তের কোণায় আশ্রয় নিয়েছিলেন কবির ও সঞ্জয়। ৯ দিন ধরে বাতাসভর্তি সেই কক্ষে বন্দি অবস্থায় সঞ্জয় প্রার্থনা করে মনোবল ধরে রেখেছিলেন। অন্যদিকে কবির বেঁচে থাকতে কাদাপানির ভেতরে শুয়ে থাকা অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে মাঝেমধ্যে সেই পানিই অল্প অল্প করে পান করতেন।
এদিকে স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে এবং প্রকল্পের প্রবেশপথ পলিমাটিতে চাপা পড়ে নদীর খালি তীরের মতো হয়ে যাওয়ার ছবি দেখে হীরা শোভা গভীর হতাশায় ডুবে যান। তবে ১৫ ও ১০ বছর বয়সী দুই ছেলের সামনে তিনি সাহসের ভান করে যাচ্ছিলেন। কর্মকর্তাদের বিশ্বাস ছিল, ধ্বংসস্তূপের নিচে সুড়ঙ্গের ভেতরের বাতাসের পকেটগুলো হয়তো কিছু কর্মীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি জানান, উপত্যকাজুড়ে ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি বাড়ি ধ্বংস হওয়ায় কোথায় আগে খনন করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। উপরন্তু, মুষলধারে বৃষ্টিতে খনন করা গর্ত বারবার ভরাট হয়ে উদ্ধারকাজ ব্যাহত করছিল।
৩-এ প্রকল্পটি উদ্ধারের তালিকায় ওপরের দিকে ছিল। প্রথম তিন দিন কাদা, পাথর ও কাঠের স্তূপের কারণে খননকাজ শুরু করা যায়নি। কিছু জায়গায় ১৫ থেকে ৩০ মিটার পুরু কাদামাটির স্তর জমে ছিল। উদ্ধারকারীরা ড্রিলিং, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ও ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে পথ তৈরি করতে শুরু করেন। ওপর থেকে ড্রিল করে ৫ ইঞ্চি ব্যাসের একটি গর্ত সুড়ঙ্গটির সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করলে প্রথম সাফল্য আসে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির বোর্ড সদস্য আমশু কিরণ শাহি জানান, সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে পৌঁছাতে উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন লেগে যায়। সেখানে পৌঁছে চিৎকার করে ডাকলেও প্রথমে কোনো সাড়া মেলেনি।
উদ্ধার পাওয়ার আগের রাতে উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসস্তূপের এমন একটি দেয়ালের মুখোমুখি হন, যা সরানো যাচ্ছিল না। তখন সুরজ দহলের দল সুড়ঙ্গের ১৫ মিটার ওপরে থাকা একটি প্রাকৃতিক জলপথ দিয়ে উচ্চ চাপে পানি প্রবাহিত করে মাত্র কয়েক মিনিটে ৪ থেকে ৫ মিটার অংশ পরিষ্কার করে ফেলেন। এরপর আবার বৃষ্টি নামলে সুড়ঙ্গের একাংশ ধসে পড়ে উদ্ধারকারীরা নিজেরাই কিছু সময়ের জন্য আটকে যান। পরে ধাতব পাত ও গ্যাবিয়ন তারের জাল ব্যবহার করে ধস ঠেকিয়ে তাঁরা আবার কাজ শুরু করেন।
দুর্যোগের দশম দিন ভোর ৪টার দিকে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গে ড্রিল করার সময় একটি অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পান। উদ্ধারকারী দলের নেতা গঙ্গা বরাল জানান, তাঁরা বারবার যন্ত্রের ইঞ্জিন বন্ধ করে কান পেতে সেই শব্দ শোনার চেষ্টা করছিলেন। তাঁরা চিৎকার করে বলছিলেন, 'আপনারা কোথায়? এখানে কি কেউ আছেন?' একপর্যায়ে একফালি আলোর মধ্যে একটি হাত দেখতে পান তাঁরা। সকাল ৭টার দিকে সেনারা সুড়ঙ্গের দেয়ালে একটি ছোট গর্ত তৈরি করতে সক্ষম হলে ভেতর থেকে ভেসে আসে একটি শব্দ—'হুনুহুনচা', যার অর্থ 'আমরা এখানে আছি।'
উদ্ধার করার সময় কবির ও সঞ্জয় কেউই দাঁড়াতে পারছিলেন না। মুখে কাদা মাখা সঞ্জয়কে পিঠে করে এবং গুরুতর আহত কবিরকে স্ট্রেচারে করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। বাবার ফিরে আসার খবর শুনে কবিরের দুই ছেলে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। এর পরদিন আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে লু হাইতাও নামের এক চীনা নাগরিককেও জীবিত উদ্ধার করা হয়। কবিরের পায়ে গভীর ক্ষতের কারণে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। হাসপাতালে স্বামীকে জীবিত ফিরে পেয়ে হীরা শোভা অত্যন্ত আনন্দিত। স্বামীকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, 'ও নতুন জীবন পেয়েছে।' এদিকে সুড়ঙ্গের ভেতরে এখনো ১২১ জন কর্মী আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাদের জীবিত উদ্ধারে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন উদ্ধারকর্মীরা।



























