গুগলের এআই সার্চে কমছে ট্রাফিক, সংকটে ওয়েবসাইটগুলোর ভবিষ্যৎ
- আপডেট সময় : ০৪:০৬:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

ইন্টারনেটের শুরু থেকে চলে আসা প্রকাশক ও সার্চ ইঞ্জিনের মধ্যকার পারস্পরিক সমঝোতা এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি। এতদিন প্রকাশকেরা তাদের কনটেন্ট গুগলকে ক্রল ও ইনডেক্স করার অনুমতি দিতেন, যার বিনিময়ে গুগল পাঠাত কাঙ্ক্ষিত ট্রাফিক। সেই ট্রাফিকের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন, সাবস্ক্রিপশন ও সরাসরি পাঠক-সম্পর্কের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যম, তথ্যভান্ডার ও নানা ধরনের অনলাইন সেবা টিকে থাকত। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক সার্চের কারণে এই চিরচেনা সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ডেইলি সাবাহতে প্রকাশিত সালিহ কায়ার একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে এআই সার্চের বিস্তারে ওয়েবসাইটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন আশঙ্কার চিত্র উঠে এসেছে।
গুগলের ‘এআই ওভারভিউ’ ফিচারটি এখন ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর সরাসরি সার্চ পেজেই সারাংশ আকারে প্রদর্শন করছে। ফলে তথ্য জানতে ব্যবহারকারীদের আর মূল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার প্রয়োজন পড়ছে না। এছাড়া গুগলের নতুন ‘এআই মোড’ কথোপকথনধর্মী অনুসন্ধান, তথ্যের সমন্বয় এবং বিভিন্ন কাজ একই প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন করার সুযোগ দিচ্ছে। এর ফলে তথ্যের পথপ্রদর্শক হিসেবে গুগলের যে ভূমিকা ছিল, তা পেরিয়ে গুগল নিজেই তথ্যের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
এআই সার্চের এই অগ্রযাত্রার নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে পরিসংখ্যানগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চার্টবিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সংবাদ ওয়েবসাইটগুলোতে গুগল সার্চ থেকে আসা ট্রাফিক আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশকদের ক্ষেত্রে এই পতনের হার ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে স্পার্কটোরোর হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে গুগলের প্রায় ৬৮ শতাংশ সার্চই শেষ হয়েছে কোনো বাইরের ওয়েবসাইটে ক্লিক না করেই, যা ২০১৯ সালে ছিল ৪৯ শতাংশ। এই ধরনের অনুসন্ধানকে ‘জিরো-ক্লিক সার্চ’ বলা হয়। ইউসিএলএর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে গুগল সার্চের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এখন কোনো পাবলিক ওয়েবসাইটে ক্লিক ছাড়াই সম্পন্ন হচ্ছে। সিয়ার ইন্টার্যাক্টিভের গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ওভারভিউ চালুর পর অর্গানিক ও পেইড উভয় ধরনের ক্লিক-থ্রু রেট ব্যাপক কমেছে, এমনকি এআই উত্তরে ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া থাকলেও তাতে ক্লিক করার হার অত্যন্ত নগণ্য।
এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে ছোট ও মাঝারি ধরনের সংবাদমাধ্যম এবং বিশেষায়িত ওয়েবসাইটগুলো। বড় বড় সংবাদ ব্র্যান্ডগুলোর নিজস্ব পাঠক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী থাকলেও, স্থানীয় ভাষার সংবাদমাধ্যম ও নতুন প্রকাশনাগুলো নতুন পাঠক পাওয়ার জন্য সম্পূর্ণভাবে সার্চ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল। সার্চে দৃশ্যমানতা কমে গেলে তাদের বিজ্ঞাপন আয় ও সাবস্ক্রিপশন সংকুচিত হবে, যা গণমাধ্যমের বহুত্ববাদকে হুমকির মুখে ফেলবে। এখানেই মূল দ্বন্দ্বটি তৈরি হচ্ছে—গুগলের এআই মডেলগুলো উত্তর তৈরি করতে ওয়েবসাইটের তথ্য ব্যবহার করছে, কিন্তু সেই উত্তর ব্যবহারকারীকে মূল ওয়েবসাইটে যাওয়া থেকে বিরত রাখছে। প্রকাশকেরা একে ‘ট্রাফিকের কাঠামোগত সংকট’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
অবশ্য গুগল এই অভিযোগ পুরোপুরি মেনে নেয়নি। তাদের দাবি, এআই ওভারভিউ ও এআই মোড ওয়েবসাইটের লিংকগুলোকে আরও দৃশ্যমান করতে কাজ করছে। ২০২৬ সালে গুগল ইনলাইন লিংক, ওয়েবসাইট প্রিভিউ এবং ‘প্রেফার্ড সোর্সেস’ সুবিধা যুক্ত করেছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের পছন্দের সংবাদমাধ্যমকে চিহ্নিত করতে পারবেন। বর্তমানে গুগলের এআই ওভারভিউয়ের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ২৫০ কোটির বেশি এবং এআই মোডের মাসিক ব্যবহারকারী ১০০ কোটির বেশি বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতি এখন কেবল প্রযুক্তি কোম্পানি ও সংবাদমাধ্যমের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি প্রতিযোগিতা নীতি ও ডিজিটাল অর্থনীতির বড় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন গুগলের এআই সার্চে প্রকাশকদের কনটেন্ট ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ইউরোপের নিয়ন্ত্রকেরা প্রকাশকদের কাছে জানতে চাইছেন, গুগলের নতুন এআই সার্চ ব্যবস্থায় নিজেদের কনটেন্ট ব্যবহারের অনুমতি বন্ধ করার সুযোগ তাদের জন্য যথেষ্ট কি না। গত ৩১ আগস্ট থেকে গুগল বিশ্বজুড়ে প্রকাশকদের জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মাধ্যমে প্রকাশকেরা চাইলে এআই ওভারভিউ ও এআই মোডে তাদের কনটেন্ট ব্যবহার বন্ধ করতে পারবেন। তবে শর্ত হলো, এআই সার্চ থেকে কনটেন্ট সরিয়ে নিলে তারা এআই ফিচার থেকে কোনো ট্রাফিক বা ইমপ্রেশন পাবেন না, যদিও সাধারণ গুগল সার্চের র্যাঙ্কিংয়ে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
গুগল মূলত একটি ‘এজেন্ট ম্যানেজার’ ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে সার্চ ইঞ্জিন নিজেই তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও উত্তর তৈরি করবে। এতে ব্যবহারকারীরা গুগলের প্ল্যাটফর্মেই বেশি সময় কাটাবেন। এই পরিবর্তনের মুখে টিকে থাকতে হলে প্রকাশকদের শুধু সার্চ-নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি পাঠক সম্পর্ক, সাবস্ক্রিপশন, নিউজলেটার ও নিজস্ব ডিজিটাল কমিউনিটি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। অন্যথায়, যে উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থা এআই-কে গড়ে তুলেছে, তা-ই একদিন মূল কনটেন্ট নির্মাতাদের অস্তিত্ব সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ৩২আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ৫১




























