ঢাকা ০৪:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কাটলে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করবে সরকার মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষার্থীদের প্রতি ডেপুটি স্পিকারের আহ্বান আবু ইয়াকুব ইউসুফ আল-কুমি: ইবন আরাবির বর্ণনায় এক সুফি সাধক সোনারগাঁয়ে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার ১২ ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহে ট্যাব ও প্রশিক্ষণ শুরু সমাজসেবা অধিদপ্তরের জাতিসংঘে আজ প্রথম ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান না ফেরার দেশে প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন বঙ্গভবনের সিংহ পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন প্রেসিডেন্ট বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমল, কারণ জানাল রয়টার্স টেকসই উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির আহ্বান ববি হাজ্জাজের

২০২৬ সালের যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিল হরমুজ প্রণালির কৌশলগত হিসাব

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:৪১:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



২০২৬ সালের যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত হিসেবে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এতদিন ধরে এই প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করার হুমকি দিলেও তেহরান বাস্তবে তা করা থেকে বিরত ছিল। কারণ, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করাকে ইরানের জন্য একটি 'শেষ অস্ত্র' হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা প্রয়োগ করলে শত্রুদের পাশাপাশি ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

গত ২৮ আগস্ট ২০২৬-এ 'সাউথ এশিয়া মনিটর'-এ প্রকাশিত অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সঞ্জয় আগরওয়ালের একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এই বিষয়টি বিশদভাবে উঠে এসেছে। তার মতে, পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এটি ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তবে প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং সীমিতভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বাধা দেওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইরান এতদিন দ্বিতীয় পথটিকেই বেশি কার্যকর মনে করে আসছিল।

ইরান নিজে তেল রপ্তানি, আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ সম্পূর্ণ বন্ধ হলে দেশটির তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। পাশাপাশি খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এই কারণেই তেহরান সম্পূর্ণ অবরোধের বদলে বিভিন্ন সময়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন, সামরিক টহল এবং নির্দিষ্ট জাহাজের চলাচল সীমিত করার মাধ্যমে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। এমনকি ২০২৬ সালের মে মাসেও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছিল যে তাদের অনুমতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল হচ্ছে।

কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর এই হিসাব ও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। হরমুজ আর কেবল ইরানের সম্ভাব্য 'শেষ অস্ত্র' হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সরাসরি সামরিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ৩১ আগস্ট লারাক দ্বীপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে মার্কিন হামলা এবং পরবর্তী ইরানি পাল্টা হামলা প্রমাণ করে যে হরমুজ এখন সরাসরি সামরিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে চাইছে, আর ইরান তার সামরিক সক্ষমতা দিয়ে এখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

এই পরিস্থিতির কারণে একটি নতুন দ্বন্দ্ব বা 'হরমুজ প্যারাডক্স' তৈরি হয়েছে। হরমুজ যত বেশি সময় বন্ধ বা অস্থিতিশীল থাকবে, বিশ্বের দেশগুলো তত বেশি বিকল্প পথ খুঁজবে। ইতিমধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানি পথের ওপর জোর দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হরমুজের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা কমে গেলে ইরানের সবচেয়ে মূল্যবান ভূকৌশলগত সম্পদের গুরুত্বই হারিয়ে যেতে পারে।

হরমুজের এই সংকটের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এশিয়াতেও এর বড় প্রভাব রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির বড় অংশ যায় চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে এসব দেশে জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত তাদের জাহাজ ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে নৌ-নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের যুদ্ধ ইরানের পুরোনো হিসাবকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালি নিজেই যুদ্ধ, অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তেহরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই জলপথকে যত বেশি অস্থিতিশীল রাখা হবে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার তত বেশি বিকল্প পথ তৈরি করবে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের ভূকৌশলগত শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ২০আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ২৮

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

২০২৬ সালের যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিল হরমুজ প্রণালির কৌশলগত হিসাব

আপডেট সময় : ০৩:৪১:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০২৬ সালের যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত হিসেবে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এতদিন ধরে এই প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করার হুমকি দিলেও তেহরান বাস্তবে তা করা থেকে বিরত ছিল। কারণ, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করাকে ইরানের জন্য একটি 'শেষ অস্ত্র' হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা প্রয়োগ করলে শত্রুদের পাশাপাশি ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

গত ২৮ আগস্ট ২০২৬-এ 'সাউথ এশিয়া মনিটর'-এ প্রকাশিত অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সঞ্জয় আগরওয়ালের একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এই বিষয়টি বিশদভাবে উঠে এসেছে। তার মতে, পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এটি ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তবে প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং সীমিতভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বাধা দেওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইরান এতদিন দ্বিতীয় পথটিকেই বেশি কার্যকর মনে করে আসছিল।

ইরান নিজে তেল রপ্তানি, আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ সম্পূর্ণ বন্ধ হলে দেশটির তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। পাশাপাশি খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এই কারণেই তেহরান সম্পূর্ণ অবরোধের বদলে বিভিন্ন সময়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন, সামরিক টহল এবং নির্দিষ্ট জাহাজের চলাচল সীমিত করার মাধ্যমে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। এমনকি ২০২৬ সালের মে মাসেও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছিল যে তাদের অনুমতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল হচ্ছে।

কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর এই হিসাব ও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। হরমুজ আর কেবল ইরানের সম্ভাব্য 'শেষ অস্ত্র' হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সরাসরি সামরিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ৩১ আগস্ট লারাক দ্বীপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে মার্কিন হামলা এবং পরবর্তী ইরানি পাল্টা হামলা প্রমাণ করে যে হরমুজ এখন সরাসরি সামরিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে চাইছে, আর ইরান তার সামরিক সক্ষমতা দিয়ে এখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

এই পরিস্থিতির কারণে একটি নতুন দ্বন্দ্ব বা 'হরমুজ প্যারাডক্স' তৈরি হয়েছে। হরমুজ যত বেশি সময় বন্ধ বা অস্থিতিশীল থাকবে, বিশ্বের দেশগুলো তত বেশি বিকল্প পথ খুঁজবে। ইতিমধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানি পথের ওপর জোর দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হরমুজের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা কমে গেলে ইরানের সবচেয়ে মূল্যবান ভূকৌশলগত সম্পদের গুরুত্বই হারিয়ে যেতে পারে।

হরমুজের এই সংকটের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এশিয়াতেও এর বড় প্রভাব রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির বড় অংশ যায় চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে এসব দেশে জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত তাদের জাহাজ ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে নৌ-নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের যুদ্ধ ইরানের পুরোনো হিসাবকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালি নিজেই যুদ্ধ, অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তেহরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই জলপথকে যত বেশি অস্থিতিশীল রাখা হবে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার তত বেশি বিকল্প পথ তৈরি করবে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের ভূকৌশলগত শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ২০আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ২৮

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh