সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান মক্কা চুক্তি: মার্কিন আধিপত্য রক্ষার নতুন কৌশল?
- আপডেট সময় : ০৯:২৯:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। এটি মূলত একটি ‘মধ্যপ্রাচ্য’, ‘আরব’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠনের মার্কিন কৌশলেরই সর্বশেষ সংস্করণ। বিশ্লেষকদের একাংশ একে তেলআবিবের বিরুদ্ধে একটি জোট হিসেবে দেখলেও, অন্য অনেকের মতে এটি সৌদি ও তার আরব প্রতিবেশীদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার পর নতুন নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা খোঁজার ইঙ্গিত। বাস্তবে এটি শীতল যুদ্ধের সময়কার মার্কিন নীতিরই একটি আধুনিক রূপ, যার লক্ষ্য পশ্চিমাপন্থী শাসনব্যবস্থা এবং তাদের নীরব মিত্র ইসরাইলকে সুরক্ষিত রাখা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি তিন দেশের এই পদক্ষেপকে ‘বড়, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। নতুন এই চুক্তিটি ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ‘সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘বাগদাদ প্যাক্ট’-এর আদলে তৈরি হয়েছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব আরও ১৩টি দেশকে নিয়ে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ (এমএমডিএ) গঠন করে। বাহরাইন, বাংলাদেশ, কোমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক এবং সৌদি-সমর্থিত এডেনভিত্তিক ইয়েমেন সরকারকে নিয়ে গঠিত এই জোটের লক্ষ্য লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরের নৌ ও জ্বালানি সরবরাহপথ নিরাপদ রাখা। ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত এই জোটটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’-এরই উত্তরসূরি।
মক্কা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র মিসর ও জর্ডানের অনুপস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মিসর এখনো তাদের অবস্থান বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার হলে সামরিক হস্তক্ষেপের বাধ্যবাধকতা থেকে বাঁচতে এই দুই দেশ চুক্তি থেকে দূরে থাকতে পারে। অন্যদিকে, কিছু ইসরাইলপন্থী বিশ্লেষক মনে করছেন, এই জোট আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশীদারদের দুর্বল করতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো স্টিভেন এ কুকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগের কারণেই তারা এমন বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে যেখানে ওয়াশিংটনের বদলে তারাই আঞ্চলিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।
তবে এই বিশ্লেষণকে পুরোপুরি বাস্তবসম্মত মনে করছেন না অনেকে। কারণ তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি ও পাকিস্তান দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক মিত্র। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবেরের মতে, এটি কোনো তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র গঠনের প্রচেষ্টা নয়, বরং এমন একটি জোট যাতে কোনো একক পক্ষ অঞ্চলটির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। গত নভেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফরের সময় সৌদি আরবকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা প্রদান এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহের প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই তাদের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ দেয়। তাই মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের বাইরে দেখা কঠিন। এটি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। কারণ তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং সৌদি আরবও ১৯৮১ সাল থেকেই ইসরাইলকে এই অঞ্চলের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।


























