বরফ গলে সমুদ্রে মিশছে বিষাক্ত পারদ, চরম ঝুঁকিতে অ্যান্টার্কটিকা
- আপডেট সময় : ০৫:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

পৃথিবীতে মানবসভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ছে বরফে ঢাকা মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে এখানকার বরফ গলছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে, যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। তবে এবার পৃথিবীর এই সর্বদক্ষিণের মহাদেশটি নতুন এক ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা জানতে পেরেছেন, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত পারদ মিশছে সমুদ্রে। এই পরিস্থিতি মানবসভ্যতার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ১০টি রাসায়নিকের তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে পারদ। অতি সামান্য পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করলেও এটি অত্যন্ত বিষাক্ত হিসেবে কাজ করে। এতদিন ধরে অ্যান্টার্কটিকার বরফ এই পারদ দূষণ ঠেকাতে বড় ভূমিকা রেখে আসছিল। বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ পারদ শোষণ করে তা নিজের বুকে জমিয়ে রেখেছিল এই মহাদেশের বরফরাশি।
প্রাকৃতিক উপায়ে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও কিছু ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশে পারদ ছড়ায়, যা খুব একটা উদ্বেগের নয়। তবে বিজ্ঞানীদের দাবি, শিল্পায়নের জন্য অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং খনি খননের মতো মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশে পারদের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আর এই ভারী শিল্পগুলো থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসই আবার বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলিয়ে দিচ্ছে। ফলে যে বরফ পারদ শোষণ করে পরিবেশ রক্ষা করছিল, বায়ুদূষণের কারণেই তা গলে গিয়ে হিতে বিপরীত ঘটাচ্ছে।
সম্প্রতি চিনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক অ্যান্টার্কটিকার বরফ ও পারদ দূষণ নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছেন। পরিবেশবিদ চেংঝেন ঝোউয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাউমি অব সায়েন্সেস’ (পিএনএএস) পত্রিকায়। বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে দ্রুত গলে যাওয়া অংশ ‘অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং সেখানকার পলির নমুনা বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগের চিত্র পেয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের বরফে দ্বিগুণ পরিমাণ পারদ জমা থাকে। বিজ্ঞানীদের দাবি, অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে এই অঞ্চলে পারদ জমার হার প্রায় ১৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
পরিবেশে পারদ দূষণের দুটি চক্র সক্রিয় থাকে। প্রথমত, বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রে পারদ যায় এবং সেখান থেকে আবার বাতাসে ফিরে আসে। দ্বিতীয়ত, অ্যান্টার্কটিকার মতো হিমবাহ অঞ্চলে বায়ুমণ্ডল থেকে পারদ বরফে জমা হয় এবং বরফ গলে তা স্থলভাগ হয়ে সমুদ্রে মেশে। গবেষক ঝোউ জানিয়েছেন, এই দুই চক্রের সংযোগের কারণে বরফ গলে স্থলভাগে পারদের নির্গমন ৫৫০ শতাংশ এবং বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রে পারদের বিনিময় ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অ্যান্টার্কটিকার বিশাল পারদের ভাণ্ডার এখন নিজেই দূষণের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।
এর আগের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, অ্যান্টার্কটিকার বরফে এমন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যা সাধারণ পারদকে অত্যন্ত শক্তিশালী নিউরোটক্সিন ‘মিথাইল মার্কারে’ পরিণত করতে পারে। এই বিষাক্ত উপাদানটি সামুদ্রিক প্রাণীদের শরীরে প্রবেশ করে এবং খাদ্যচক্রের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত মানুষের দেহেও পৌঁছাতে পারে। চেংঝেন ঝোউ সতর্ক করে বলেছেন, অ্যান্টার্কটিকার বর্তমান পারদ দূষণ পরিস্থিতি ওখানকার পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।
ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, দক্ষিণের মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাণীদের শরীরে পারদের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ থেকে সমুদ্রের স্রোতের মাধ্যমে খোলা পানিতে পারদ ছড়িয়ে পড়ার হার ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই বিষাক্ত দূষণ আগামী দিনে পৃথিবীর আরও দূরবর্তী মহাসাগরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ০৩আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৩৭





























