হোয়াটসঅ্যাপ প্রজন্মের বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে ইনস্টাগ্রাম প্রজন্ম

- আপডেট সময় : ০৬:৪১:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ভারতে কট্টর হিন্দুত্ববাদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারী প্রজন্মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক নতুন বিদ্রোহী শক্তির উত্থান ঘটেছে, যা মূলত ইনস্টাগ্রাম প্রজন্ম। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি যেখানে হোয়াটসঅ্যাপের দুনিয়াকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সব কৌশল জানত এবং এই প্রজন্মকে নিজেদের ইশারায় চালাতে পারত, সেখানে ইনস্টাগ্রামের জগতে এসে তারা রীতিমতো দিশেহারা। এই তরুণ প্রজন্মকে দমাতে এখন তাদের হাতে পেশিশক্তি ছাড়া আর কোনো কার্যকর উপায় অবশিষ্ট নেই।
পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে এই দুই প্রজন্মের মধ্যকার দূরত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন মা-বাবারা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তা সন্তানদের খুলে দেখতেও পান না। পরবর্তীতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে, তরুণরা এখন যোগাযোগ রক্ষার জন্য ইনস্টাগ্রাম বা স্ন্যাপচ্যাটের মতো মাধ্যমগুলোকে বেশি পছন্দ করছে। এমনকি মা-বাবারা যখন ইনস্টাগ্রামে সন্তানদের খুঁজতে যান, তখন বেশির ভাগ সময়ই তাদের অ্যাকাউন্ট খুঁজে পান না। এই যে হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মধ্যকার ব্যবধান, ঠিক এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিজেপি নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় রাষ্ট্র এবং দেশের সবচেয়ে তরুণ প্রজন্মের সম্পর্কের মধ্যে।
২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করা হোয়াটসঅ্যাপের বর্তমান ব্যবহারকারী ৩০০ কোটির বেশি, অন্যদিকে ২০১০ সালে আসা ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারী ২৩৫ কোটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কোনো নিখুঁত পরিসংখ্যান না থাকলেও তরুণদের পছন্দের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটক। প্রবীণরা মূলত তরুণদের সঙ্গে তাল মেলাতে এসব মাধ্যমে এলেও সেখানে তাঁদের অনেকটা অনধিকার প্রবেশকারীর মতোই মনে হয়। তাঁদের আসল আড্ডার জায়গা হলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, যেখান থেকে তাঁরা ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’ খেতাব পেয়েছেন।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগের যুগে হোয়াটসঅ্যাপ প্রজন্মের বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়েছিল। তুলনামূলক সহজে চাকরি পেয়ে শহরে পাড়ি জমানো এই প্রজন্মটি সহজাতভাবেই হিন্দুত্ববাদী। তিরিশের কোঠায় এসে তারা হোয়াটসঅ্যাপকে নিজেদের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। সেখানে ফরোয়ার্ড হয়ে আসা যেকোনো বার্তা চোখ বুজে বিশ্বাস করে এবং তা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের কুসংস্কার ও অর্ধসত্য ইতিহাসের পাঠ প্রচার করে। এই প্রজন্মের একটি অংশ আবার অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে নাগরিকত্বের অপেক্ষা করছে, যারা চায় কয়েক হাজার বছর আগের কাল্পনিক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে অন্যের সন্তানেরা নতুন করে যুদ্ধ শুরু করুক, অথচ নিজেদের সন্তানের ভাবনা কী তা তারা দেখতে পায় না।
একটা সময়ে রাষ্ট্র ও ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’দের ভাষা একই রকম হয়ে দাঁড়ায়। তারা প্রতিনিয়ত উপদেশ দিয়ে যায়—কী খেতে হবে, কী পরা উচিত, কীভাবে বিয়ে করা দরকার কিংবা চাকরি না পেলে নিজে কিছু করার কথা। এই গোঁড়ামি আর চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থেকে বাঁচতে সম্প্রতি অনেক অনলাইন আন্দোলনকারী তাঁদের পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলো থেকে বেরিয়ে আসার কথা জানিয়েছেন।
প্রজন্মের এই নাটকীয় পরিবর্তনের চিত্র শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি বিশ্বজুড়েই ঘটছে। যেমন তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের সময় দেখা গেছে, মা-বাবারা যখন পুরোনো দ্রাবিড় দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখছেন, তখন তরুণরা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর (থালাপতি বিজয়) ও তাঁর দল ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান রাজনীতিক নিকি হ্যালি যেখানে ইসরায়েল ও মার্কিন সামরিক মতবাদের কট্টর সমর্থক, সেখানে ২০০১ সালে জন্ম নেওয়া তাঁর নিজের ছেলে নালিন হ্যালি এই নীতিগুলোর চরম সমালোচক। এভাবে টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম প্রজন্ম মার্কিন সামরিক নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐকমত্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
ইনস্টাগ্রাম এখন যেন মুক্তির এক গোপন ডিজিটাল আস্তানা, যা আমেরিকার দাসদের মুক্ত করার গোপন নেটওয়ার্ক ‘আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড’-এর আধুনিক রূপ। এই মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগের অধীন অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) বা প্রধান তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) দিয়ে ভয় দেখানো সম্ভব নয়। কারণ, তারা ব্যাপক দুর্নীতি বা বহুদলীয় রাজনীতির অর্থ আত্মসাতের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত নয়। দিল্লি পুলিশ কিংবা প্রশাসন হয়তো এই নতুন প্রজন্মের আন্দোলনের মাত্রা সহজে বুঝতে পারছে না, যার কারণে আটক হওয়া বিক্ষোভকারীরা শেষ পর্যন্ত যন্তর মন্তরে ছাড়া পেয়েই যাচ্ছেন। ফলে রাষ্ট্র এখন তাদের দমাতে কেবল পেশিশক্তি প্রয়োগের পথেই হাঁটছে। কিন্তু প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে এটি কাজে দিলেও দেশের মূল ভূখণ্ডে তা অত্যন্ত জটিল। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, কত দিন ধরে এই বলপ্রয়োগ করা সম্ভব এবং ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’রা কবে বুঝতে পারবেন যে এই বিদ্রোহী তরুণরা আসলে অন্য কেউ নয়, তাদেরই নিজেদের সন্তান।

























