ঢাকা ০৫:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শ্যামনগরে মুন্ডা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব উদযাপিত মালয়েশিয়ায় শিশু নির্যাতনবিরোধী অভিযানে বাংলাদেশি সহ ৫৩ জন আটক ইউরোপের কৌশলগত অংশীদার হতে এয়ারবাস কেনা গুরুত্বপূর্ণ: ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্বালানি অস্থিরতার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দায়ী: রুহুল কবির রিজভী বিএসসিপিএলসির মনোপলিতে আটকে আছে সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের স্বপ্ন গ্রিনল্যান্ড চুক্তি: ট্রাম্পের কূটনৈতিক জয় নাকি বাহ্যিক কৌশল ডায়ানার ছবি নিয়ে ভুল স্বীকার, মরগানের কাছে ক্ষমা চাইলেন স্পেন্সার সাতক্ষীরায় ১ম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত ভারত-জাপান ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন তৈরি হলো বিতর্ক জ্বালানি তেলের দাম একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর বিকল্প যেখানে ছিল

জন পিলজারের ‘টেল মি নো লাইস’: সত্য সন্ধানী সাংবাদিকতার দলিল

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৫:০৯:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



খবরের পৃথিবী সব সময় সত্যের পৃথিবী নয়। সংবাদ তৈরির আগেই অনেক সময় সরকার বা বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের দেয়াল তৈরি হয়, যার ভেতর দিয়ে গণমাধ্যমকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়। এই হারিয়ে যাওয়া সত্যের খোঁজে জন পিলজারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৮৭১ পৃষ্ঠার বই ‘টেল মি নো লাইস’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা সাহসী অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে সাজানো এই বইটি যেন অন্ধকার ঘরে রাখা অনেকগুলো ছোট আলোর দিশা।

বইটিতে প্রতিটি প্রতিবেদনের আগে পিলজার সেই সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। কেন প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছিল, সাংবাদিকরা কীভাবে সত্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং সেই সত্য প্রকাশের জন্য তাদের কী মূল্য দিতে হয়েছিল—তা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্ন হলেও তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন মিল রয়েছে; তারা ক্ষমতাবানদের সহজ উত্তর বা শেষ কথা মেনে নেননি। বরং তারা প্রশ্ন করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের চড়া মূল্যও দিয়েছেন।

বইটিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্ধকার তুলে ধরেছেন জেমস ক্যামেরন ও সেমুর এম. হার্শ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের সহিংসতা নিয়ে লিখেছেন ম্যাক্স দু প্রিজ ও জ্যাক পাউ। এছাড়া আন্না পলিটকভস্কায়া চেচনিয়ার যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং আমিরা হাস ফিলিস্তিনিদের জীবন নিয়ে লিখেছেন, যেখানে দখলদারির ছায়ায় মানুষের জীবন প্রতিদিন সংকুচিত হচ্ছে।

বইটির পাতায় বারবার একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ক্ষমতা সত্যকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করতে চায়। গুন্টার ভালরাফ অভিবাসী শ্রমিকের ছদ্মবেশে জার্মানির শ্রমজীবী মানুষের জীবন দেখেছেন, পল ফুট লকারবি বিস্ফোরণের গোপন প্রশ্নগুলো অনুসরণ করেছেন, সিমাস মিলন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার গোপন কর্মকাণ্ড উন্মোচন করেছেন এবং ফিলিপ নাইটলি থ্যালিডোমাইড কেলেঙ্কারির পেছনে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ভূমিকা অনুসন্ধান করেছেন। এই প্রতিবেদনগুলো এমন একটি অস্বস্তিকর পৃথিবী দেখায়, যেখানে ক্ষমতাবানরা অপরাধ করেও নিজেদের গল্পটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

বইটির শেষ অংশে ইরাক নিয়ে রবার্ট ফিস্কসহ কয়েকজন সাংবাদিকের কাজগুলো আরও হৃদয়স্পর্শী। সেখানে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রচারণার ভেতরে আটকে থাকা সাধারণ মানুষের কথা উঠে আসে, যা প্রমাণ করে যে যুদ্ধ শেষ হলেও তার মৃত্যু বা ছায়া মানুষের ঘর, শরীর ও স্মৃতির মধ্যে দীর্ঘকাল থেকে যায়।

প্রযুক্তির উৎকর্ষ বা সংবাদের দ্রুত প্রসারের যুগে সাংবাদিকতা স্বাধীন হওয়ার বদলে বড় গণমাধ্যমগুলো রাষ্ট্র ও করপোরেট শক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে সত্য জানা থাকলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে পিলজার পুরোপুরি হতাশ নন; তিনি ইন্টারনেট ও তৃণমূল সাংবাদিকতার মধ্যে নতুন সম্ভাবনা দেখেছেন। ‘টেল মি নো লাইস’ কেবল বিখ্যাত প্রতিবেদনের সংকলন নয়, এটি সাংবাদিকতার সামনে একটি বড় প্রশ্নও ছুড়ে দেয়—যখন সবাই একটি কথা বলছে, তখন যে মানুষটি অন্য কথাটি বলার সাহস করে, তার পাশে কে দাঁড়াবে?

একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু খবর পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং কখনো কখনো তার কাজ হলো সেই জায়গায় দাঁড়ানো যেখানে অন্যরা তাকাতে চায় না—মৃত, পরাজিত বা ভুলে যাওয়া মানুষের পাশে। সেখানে সত্য হয়তো খুব উজ্জ্বল নয়, কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে সেই ক্ষীণ আলোই যথেষ্ট। ৮৭১ পৃষ্ঠার এই বইটির মূল্য ২০ পাউন্ড এবং এটি জোনাথন কেপ থেকে প্রকাশিত।

জন পিলজারের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘টেল মি নো লাইস’ সেই হারিয়ে যাওয়া সত্যের দিকে ফিরে তাকানোর একটি চেষ্টা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে তৈরি এই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার বইটি যেন অন্ধকার ঘরে রাখা অনেকগুলো ছোট আলো।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

জন পিলজারের ‘টেল মি নো লাইস’: সত্য সন্ধানী সাংবাদিকতার দলিল

আপডেট সময় : ০৫:০৯:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খবরের পৃথিবী সব সময় সত্যের পৃথিবী নয়। সংবাদ তৈরির আগেই অনেক সময় সরকার বা বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের দেয়াল তৈরি হয়, যার ভেতর দিয়ে গণমাধ্যমকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়। এই হারিয়ে যাওয়া সত্যের খোঁজে জন পিলজারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৮৭১ পৃষ্ঠার বই ‘টেল মি নো লাইস’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা সাহসী অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে সাজানো এই বইটি যেন অন্ধকার ঘরে রাখা অনেকগুলো ছোট আলোর দিশা।

বইটিতে প্রতিটি প্রতিবেদনের আগে পিলজার সেই সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। কেন প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছিল, সাংবাদিকরা কীভাবে সত্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং সেই সত্য প্রকাশের জন্য তাদের কী মূল্য দিতে হয়েছিল—তা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্ন হলেও তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন মিল রয়েছে; তারা ক্ষমতাবানদের সহজ উত্তর বা শেষ কথা মেনে নেননি। বরং তারা প্রশ্ন করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের চড়া মূল্যও দিয়েছেন।

বইটিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্ধকার তুলে ধরেছেন জেমস ক্যামেরন ও সেমুর এম. হার্শ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের সহিংসতা নিয়ে লিখেছেন ম্যাক্স দু প্রিজ ও জ্যাক পাউ। এছাড়া আন্না পলিটকভস্কায়া চেচনিয়ার যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং আমিরা হাস ফিলিস্তিনিদের জীবন নিয়ে লিখেছেন, যেখানে দখলদারির ছায়ায় মানুষের জীবন প্রতিদিন সংকুচিত হচ্ছে।

বইটির পাতায় বারবার একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ক্ষমতা সত্যকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করতে চায়। গুন্টার ভালরাফ অভিবাসী শ্রমিকের ছদ্মবেশে জার্মানির শ্রমজীবী মানুষের জীবন দেখেছেন, পল ফুট লকারবি বিস্ফোরণের গোপন প্রশ্নগুলো অনুসরণ করেছেন, সিমাস মিলন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার গোপন কর্মকাণ্ড উন্মোচন করেছেন এবং ফিলিপ নাইটলি থ্যালিডোমাইড কেলেঙ্কারির পেছনে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ভূমিকা অনুসন্ধান করেছেন। এই প্রতিবেদনগুলো এমন একটি অস্বস্তিকর পৃথিবী দেখায়, যেখানে ক্ষমতাবানরা অপরাধ করেও নিজেদের গল্পটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

বইটির শেষ অংশে ইরাক নিয়ে রবার্ট ফিস্কসহ কয়েকজন সাংবাদিকের কাজগুলো আরও হৃদয়স্পর্শী। সেখানে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রচারণার ভেতরে আটকে থাকা সাধারণ মানুষের কথা উঠে আসে, যা প্রমাণ করে যে যুদ্ধ শেষ হলেও তার মৃত্যু বা ছায়া মানুষের ঘর, শরীর ও স্মৃতির মধ্যে দীর্ঘকাল থেকে যায়।

প্রযুক্তির উৎকর্ষ বা সংবাদের দ্রুত প্রসারের যুগে সাংবাদিকতা স্বাধীন হওয়ার বদলে বড় গণমাধ্যমগুলো রাষ্ট্র ও করপোরেট শক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে সত্য জানা থাকলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে পিলজার পুরোপুরি হতাশ নন; তিনি ইন্টারনেট ও তৃণমূল সাংবাদিকতার মধ্যে নতুন সম্ভাবনা দেখেছেন। ‘টেল মি নো লাইস’ কেবল বিখ্যাত প্রতিবেদনের সংকলন নয়, এটি সাংবাদিকতার সামনে একটি বড় প্রশ্নও ছুড়ে দেয়—যখন সবাই একটি কথা বলছে, তখন যে মানুষটি অন্য কথাটি বলার সাহস করে, তার পাশে কে দাঁড়াবে?

একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু খবর পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং কখনো কখনো তার কাজ হলো সেই জায়গায় দাঁড়ানো যেখানে অন্যরা তাকাতে চায় না—মৃত, পরাজিত বা ভুলে যাওয়া মানুষের পাশে। সেখানে সত্য হয়তো খুব উজ্জ্বল নয়, কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে সেই ক্ষীণ আলোই যথেষ্ট। ৮৭১ পৃষ্ঠার এই বইটির মূল্য ২০ পাউন্ড এবং এটি জোনাথন কেপ থেকে প্রকাশিত।

জন পিলজারের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘টেল মি নো লাইস’ সেই হারিয়ে যাওয়া সত্যের দিকে ফিরে তাকানোর একটি চেষ্টা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে তৈরি এই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার বইটি যেন অন্ধকার ঘরে রাখা অনেকগুলো ছোট আলো।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin