ঢাকা ০৪:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দেশকে সবুজ ও বাসযোগ্য করতে শিশুদের গাছ লাগানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পর পদত্যাগ করলেন ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সিভিরিদেঙ্কো এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লংমার্চ: সাইন্সল্যাব মোড় অবরোধে স্থবির যান চলাচল ক্রমবর্ধমান বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কেন প্রয়োজন উন্মুক্ত পন্থা গণভোটের ম্যান্ডেট অস্বীকার করা রাজনৈতিক প্রতারণা: জেএসডি ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল সেমিফাইনালে, নতুন ইতিহাসের সাক্ষী বিশ্বকাপ বৃহস্পতিবার থেকে খুলছে বান্দরবানের সব পর্যটন কেন্দ্র টানা তৃতীয়বার বড় আসরের ফাইনালে স্পেন, বিদায় ফ্রান্সের ইরানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭ সেনাসহ ৩৭ জনের প্রাণহানি ইরানি হামলায় কুয়েত ও বাহরাইনে সতর্কতা জারি, সক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ক্রমবর্ধমান বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কেন প্রয়োজন উন্মুক্ত পন্থা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:১৫:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের দুর্ভোগ বর্ণনাতীত। ঢাকা-কক্সবাজার রুটের ট্রেন চলাচলও পানিবন্দী হওয়ার কারণে ব্যাহত হয়েছে। বৃহত্তর সিলেটেও একই চিত্র দেখা দিয়েছে। দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো এবং পুনর্বাসন এখনকার সবচেয়ে জরুরি কাজ হলেও, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য এর মূল কারণগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন।

বন্যা ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ দুটি কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক কারণের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন অন্যতম। যেমন পশ্চিম সুন্দরবন উপকূলে ১৯৮৫-১৯৯৮ সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের বার্ষিক উচ্চতা বৃদ্ধি ৩ দশমিক ২৪ মিলিমিটার হলেও কক্সবাজারে ১৯৭৮-১৯৯৮ সময়কালের জন্য এর পরিমাণ ছিল বার্ষিক ৭ দশমিক ৮ মিলিমিটার। জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিতীয় অভিঘাত হলো বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ঋতুভেদ বৃদ্ধি। এছাড়া ১৯৪৮ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বার্ষিক বৃষ্টিপাত গড়ে ৩ দশমিক ৯৬ মিলিমিটার বেড়েছে, যার বড় অংশই বর্ষাকালের।

অভ্যন্তরীণ সমস্যার মূল কারণ হলো গত ৭০ বছর ধরে অনুসরণ করা ভুল নীতি। পঞ্চাশের দশকে বিদেশি পরামর্শকদের প্ররোচনায় বাংলাদেশ নদ-নদীর ওপর ‘বেষ্টনী পন্থা’ বা পোল্ডার ও বাঁধ নির্মাণের নীতি গ্রহণ করে। শুধু উপকূলেই প্রায় ৫ হাজার মাইলের বেশি দৈর্ঘ্যের বেড়িবাঁধের মাধ্যমে প্রায় ১৪০টি পোল্ডার নির্মিত হয়। পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও তা পোল্ডারের ভেতর বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরির বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। কিন্তু ১৯৮৮ সালের বন্যার পর এরশাদ সরকার তড়িঘড়ি করে ‘বৃহত্তর ঢাকা পশ্চিম তীর বাঁধ’ নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা শহরকে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যা জলাবদ্ধতা তীব্র করেছে। এছাড়া নদীর ওপর যত্রতত্র স্লুইসগেট ও ফ্ল্যাপগেট নির্মাণ এবং নদী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। বাপা’র চকরিয়া শাখার সম্পাদক আলাউদ্দিন আলোর মতে, স্লুইসগেটগুলো পানি সরতে বাধা দেয়ায় স্থানীয়রা এগুলো ভেঙে ফেলতে চায়, কিন্তু তাতে কর্তৃপক্ষ বাধা দেয়।

পাহাড়ি এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা অস্বাভাবিক মনে হলেও, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এর মূল কারণ। পাহাড়ের গা অনাবৃত করে প্লানটেশন কৃষি এবং সমতলের মানুষের অভিবাসনের ফলে পাহাড়ের মাটি নদীর তলদেশ ভরাট করছে। একই সাথে প্লাবনভূমিতে মাটি উঁচু করে মহাসড়ক ও রেললাইন নির্মাণ পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এবং রেললাইন নির্মাণের পর ওই এলাকায় ঘন ঘন বন্যা দেখা দিচ্ছে, যা এই ভুল নীতিরই প্রতিফলন।

স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে ‘উন্মুক্ত পন্থা’ রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রথম ধাপে ঢাকা শহরের খালগুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোর সাথে নদীর সংযোগ উন্মুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে বেষ্টনীগুলোর ভেতরে নদীর পানি আসা-যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যা ভবদহের মতো এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর হবে। তৃতীয়ত, প্লাবনভূমিতে সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটি উঁচু না করে পিলারের ওপর রাস্তা তৈরি করতে হবে এবং বিদ্যমান সড়কগুলোর ডিজাইনে পর্যাপ্ত সেতু ও কালভার্ট যুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, উপকূলের পোল্ডারগুলোকে অষ্টমাসী বাঁধে রূপান্তর করতে হবে যাতে পলি জমে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। কায়েমি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ক্রমবর্ধমান বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কেন প্রয়োজন উন্মুক্ত পন্থা

আপডেট সময় : ০৩:১৫:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
print news

বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের দুর্ভোগ বর্ণনাতীত। ঢাকা-কক্সবাজার রুটের ট্রেন চলাচলও পানিবন্দী হওয়ার কারণে ব্যাহত হয়েছে। বৃহত্তর সিলেটেও একই চিত্র দেখা দিয়েছে। দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো এবং পুনর্বাসন এখনকার সবচেয়ে জরুরি কাজ হলেও, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য এর মূল কারণগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন।

বন্যা ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ দুটি কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক কারণের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন অন্যতম। যেমন পশ্চিম সুন্দরবন উপকূলে ১৯৮৫-১৯৯৮ সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের বার্ষিক উচ্চতা বৃদ্ধি ৩ দশমিক ২৪ মিলিমিটার হলেও কক্সবাজারে ১৯৭৮-১৯৯৮ সময়কালের জন্য এর পরিমাণ ছিল বার্ষিক ৭ দশমিক ৮ মিলিমিটার। জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিতীয় অভিঘাত হলো বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ঋতুভেদ বৃদ্ধি। এছাড়া ১৯৪৮ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বার্ষিক বৃষ্টিপাত গড়ে ৩ দশমিক ৯৬ মিলিমিটার বেড়েছে, যার বড় অংশই বর্ষাকালের।

অভ্যন্তরীণ সমস্যার মূল কারণ হলো গত ৭০ বছর ধরে অনুসরণ করা ভুল নীতি। পঞ্চাশের দশকে বিদেশি পরামর্শকদের প্ররোচনায় বাংলাদেশ নদ-নদীর ওপর ‘বেষ্টনী পন্থা’ বা পোল্ডার ও বাঁধ নির্মাণের নীতি গ্রহণ করে। শুধু উপকূলেই প্রায় ৫ হাজার মাইলের বেশি দৈর্ঘ্যের বেড়িবাঁধের মাধ্যমে প্রায় ১৪০টি পোল্ডার নির্মিত হয়। পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও তা পোল্ডারের ভেতর বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরির বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। কিন্তু ১৯৮৮ সালের বন্যার পর এরশাদ সরকার তড়িঘড়ি করে ‘বৃহত্তর ঢাকা পশ্চিম তীর বাঁধ’ নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা শহরকে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যা জলাবদ্ধতা তীব্র করেছে। এছাড়া নদীর ওপর যত্রতত্র স্লুইসগেট ও ফ্ল্যাপগেট নির্মাণ এবং নদী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। বাপা’র চকরিয়া শাখার সম্পাদক আলাউদ্দিন আলোর মতে, স্লুইসগেটগুলো পানি সরতে বাধা দেয়ায় স্থানীয়রা এগুলো ভেঙে ফেলতে চায়, কিন্তু তাতে কর্তৃপক্ষ বাধা দেয়।

পাহাড়ি এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা অস্বাভাবিক মনে হলেও, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এর মূল কারণ। পাহাড়ের গা অনাবৃত করে প্লানটেশন কৃষি এবং সমতলের মানুষের অভিবাসনের ফলে পাহাড়ের মাটি নদীর তলদেশ ভরাট করছে। একই সাথে প্লাবনভূমিতে মাটি উঁচু করে মহাসড়ক ও রেললাইন নির্মাণ পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এবং রেললাইন নির্মাণের পর ওই এলাকায় ঘন ঘন বন্যা দেখা দিচ্ছে, যা এই ভুল নীতিরই প্রতিফলন।

স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে ‘উন্মুক্ত পন্থা’ রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রথম ধাপে ঢাকা শহরের খালগুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোর সাথে নদীর সংযোগ উন্মুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে বেষ্টনীগুলোর ভেতরে নদীর পানি আসা-যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যা ভবদহের মতো এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর হবে। তৃতীয়ত, প্লাবনভূমিতে সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটি উঁচু না করে পিলারের ওপর রাস্তা তৈরি করতে হবে এবং বিদ্যমান সড়কগুলোর ডিজাইনে পর্যাপ্ত সেতু ও কালভার্ট যুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, উপকূলের পোল্ডারগুলোকে অষ্টমাসী বাঁধে রূপান্তর করতে হবে যাতে পলি জমে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। কায়েমি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo