৪ শিক্ষকের কাঁধে ৭ ব্যাচ, সেশনজটের শঙ্কায় কুবির আইন বিভাগ
- আপডেট সময় : ০৬:৩৮:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আইন বিভাগে দীর্ঘদিনের তীব্র শিক্ষকসংকটের কারণে একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, সময়মতো পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং ফলাফল প্রকাশ ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিভাগটিতে দীর্ঘমেয়াদি সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে যাত্রা শুরু করা এই বিভাগে বর্তমানে মাত্র আটজন শিক্ষক রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে চারজনই শিক্ষা ছুটিতে থাকায় বর্তমানে মাত্র চারজন শিক্ষককে সাতটি ব্যাচের পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক সব দায়িত্ব একা সামলাতে হচ্ছে। শিক্ষকসংকট সামাল দিতে বাইরের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস নেওয়া হলেও তাদের নিয়মিত বিভাগীয় ক্লাসের সাথে সময়সূচি মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান।
বিভাগীয় সূত্র জানায়, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় কর্মরত শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে। এতে নির্ধারিত সময়ে একাডেমিক কার্যক্রম শেষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগে গত ২৩ জুন সেশনজট কমানোর দাবিতে বিভাগে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। সে সময় তারা ছয় দফা দাবি জানান। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল, আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন এবং ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান সাদিয়া তাবাসসুম শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে একাডেমিক ক্যালেন্ডার পরিমার্জন করা হলেও শিক্ষকসংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. বায়েজিদ হোসেন জানান, তাদের দুটি কোর্সের ক্লাস নিচ্ছেন অন্য বিভাগের শিক্ষকরা, যার মধ্যে একজন বিজনেস ফ্যাকাল্টি এবং অন্যজন সোশ্যাল সায়েন্সের। অন্য বিভাগের শিক্ষকরা নিজেদের ক্লাস শেষ করে এখানে আসায় ক্লাসের রুটিন মিলছে না এবং শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই তারা শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্তমান উপাচার্যের সাথে দেখা করলে তিনি ইউজিসির অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন।
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি বিভাগটিতে কোনো অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক বা ডক্টরেট ডিগ্রিধারী শিক্ষক নেই। বর্তমানে কর্মরত আটজন শিক্ষকের সবাই সহকারী অধ্যাপক। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিভাগটি কোনো সিনিয়র শিক্ষক ছাড়াই চলছে। আরেক শিক্ষার্থী ইয়াসিন পাঠান সৈকত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির মেধাবী শিক্ষার্থীরা আইন বিভাগে ভর্তি হলেও স্বতন্ত্র এই অনুষদটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। সাতটি ব্যাচের বিপরীতে মাত্র চারজন শিক্ষক থাকায় প্রতিটি ব্যাচের প্রায় ৬০ শতাংশ কোর্স গেস্ট টিচারের মাধ্যমে শেষ করতে হচ্ছে। তিনি দ্রুত অধ্যাপকসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং নতুন ক্যাম্পাসে স্বতন্ত্র অনুষদ ভবন বরাদ্দের দাবি জানান।
একই বিভাগের শিক্ষার্থী যোবায়ের আহমেদ বলেন, বিভাগ চালুর ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখানে কোনো অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ থেকে আসা অতিথি শিক্ষকদের সুবিধামতো ক্লাসরুটিন অনেক নমনীয় করতে হয়, যা নিয়মিত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে হতো না। দ্রুত সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
শিক্ষকসংকটের কারণে অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান সাদিয়া তাবাসসুম। তিনি জানান, তীব্র শিক্ষকসংকটের মধ্যেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীদের দেওয়া রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ করছেন। সংকটের কারণে বর্তমানে তাদের একেকজন শিক্ষককে ছয়টি করে কোর্স নিতে হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর তৎকালীন উপাচার্য হায়দার আলী শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত কেন তা হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
এ বিষয়ে আইন অনুষদের ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমানে পার্টটাইম শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালানো হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভর করে না, এর জন্য ইউজিসির অনুমতি প্রয়োজন। ফাঁকা পদ এবং শিক্ষা ছুটির বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ইউজিসির কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি পেলেই দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, আইন বিভাগের এই সংকটের কথা তারা জানেন এবং সাময়িকভাবে অতিথি শিক্ষক দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। শিক্ষক নিয়োগের জন্য ইউজিসির কাছে পদের আবেদন করা হয়েছে। অর্গানোগ্রাম প্রস্তুত রয়েছে এবং অনুমতি পেলেই যথাযথ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।




























