কারখানার শ্রমিক থেকে অ্যাপল-টেসলার সরবরাহকারী এক চীনা নারীর উত্থান
- আপডেট সময় : ০২:৪৫:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

চীনের একটি রাষ্ট্রীয় ভোজে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আমন্ত্রণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক বিশেষ দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। সেখানে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক ও টেসলার প্রধান ইলন মাস্কের ঠিক মাঝখানে বসেছিলেন এক নারী। তিনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, বরং চীনের বেসরকারি খাতের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা ঝোউ ছুনফেই। এই আসনবিন্যাস কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত লেন্স টেকনোলজির গুরুত্ব কতটা গভীর, তারই এক বড় প্রমাণ।
ঝোউ ছুনফেইয়ের এই অবস্থানে পৌঁছানোর গল্পটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়। হুনান প্রদেশের এক দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ঝোউ মাত্র ১৫ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণ চীনের শেনঝেন শহরের দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পাঞ্চলে চলে যান। সেখানে তিনি একটি কারখানায় কাচ তৈরির কাজ শুরু করেন। চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সেই শুরুর দিনগুলোতে লাখ লাখ শ্রমিকের মতো তাঁকেও কঠোর নিয়ম ও তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হতো। তবে ঝোউ অন্য সবার চেয়ে আলাদা ছিলেন; তিনি কারখানার পুরো উৎপাদনপ্রক্রিয়া খুব মন দিয়ে শিখতেন। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯৩ সালে তিনি নিজের একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেন।
শুরুতে ঝোউয়ের কারখানাটি ছিল খুবই ছোট, যেখানে মূলত ঘড়ির কাচের ওপর নকশা ও লেখা ছাপার কাজ হতো। ব্যবসাটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ইলেকট্রনিক পণ্য যত ছোট ও হালকা হবে, সেগুলো তৈরিতে সূক্ষ্ম প্রযুক্তির গুরুত্ব তত বাড়বে। তাঁর এই দূরদর্শী ধারণা থেকেই লেন্স টেকনোলজি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং বড় বড় ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাচ ও টাচস্ক্রিন উপাদান তৈরি শুরু করে। ২০১৫ সালে লেন্স টেকনোলজি শেনঝেনের চাইনেক্সট শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এর মাধ্যমে ঝোউ চীনের অন্যতম ধনী ও সফল স্বপ্রতিষ্ঠিত নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর এই বিশাল সম্পদ কোনো উত্তরাধিকার বা আবাসন ও ইন্টারনেট ব্যবসার মাধ্যমে আসেনি, বরং এসেছে উৎপাদন খাতের গভীর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার হাত ধরে।
স্মার্টফোনের যুগে লেন্স টেকনোলজি দ্রুত অ্যাপলের সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে অন্যতম প্রধান অংশীদার হয়ে ওঠে। অ্যাপলের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের জন্য নিখুঁত ও মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে লেন্স। শুধু অ্যাপলই নয়, বর্তমানে ইলন মাস্কের টেসলা কোম্পানির স্মার্ট গাড়ি ও ভবিষ্যতের রোবট প্রকল্পের জন্যও উন্নত উপকরণ ও কাঠামোগত যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে তারা। কাচ ও ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিখুঁত যন্ত্রাংশ তৈরিতে লেন্সের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মাস্কের টেসলা, অপটিমাস রোবট ও স্পেসএক্সের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর সঙ্গে দারুণভাবে মিলে গেছে। লেন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উত্তর আমেরিকায় তাদের একটি বড় গ্রাহক রয়েছে, যাকে বিনিয়োগকারীরা টেসলা বলেই মনে করছেন।
বর্তমানে লেন্স টেকনোলজি কেবল স্মার্টফোনের কাচ তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এআই হার্ডওয়্যারের যুগে তারা স্মার্ট গাড়ি, এআই চশমা, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, গাড়ির ককপিট, মহাকাশপ্রযুক্তি এবং মানুষের মতো দেখতে রোবটের যন্ত্রাংশ তৈরিতে বড় বিনিয়োগ করছে। এমনকি অতি পাতলা সৌর প্যানেলের কাচ ও মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী নমনীয় কাচ নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই রূপান্তর কেবল লেন্সেরই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে চীনের শিল্পনীতির পরিবর্তনেরও একটি বড় উদাহরণ। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে দীর্ঘদিন ধরে চীন কেবল সস্তায় পণ্য তৈরির দেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, এখন দেশটি উন্নত প্রকৌশল, এআই, রোবট ও মহাকাশপ্রযুক্তির নেতৃত্ব দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে।
অবশ্য এই পরিবর্তনের পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে লেন্স টেকনোলজির আয় কমে গেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিট লোকসানের মুখে পড়েছে। স্মার্টফোনের বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের চাপ এই লোকসানের পেছনে বড় কারণ ছিল। স্মার্টফোনের বাজার এখন অনেকটাই স্থিতিশীল হওয়ায় ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের ওপর নির্ভরশীল লেন্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে হচ্ছে। এআই হার্ডওয়্যার ও স্মার্ট গাড়ির বাজার অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও এখানে প্রতিযোগিতা যেমন তীব্র, তেমনই বিনিয়োগের পরিমাণও অনেক বেশি।
ঝোউ ছুনফেইয়ের এই গল্পটি বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তির আলোচনায় সফটওয়্যার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম বেশি প্রাধান্য পেলেও, বাস্তব বিশ্ব এখনো ভৌত উৎপাদনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। আধুনিক জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনীয় ডিভাইসের জন্য কাচ, সেন্সর ও সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ কাউকে না কাউকে তৈরি করতেই হয়। শেনঝেনের কারখানায় কাজ করা লাখ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ঝোউ ছুনফেই অন্যতম ব্যতিক্রমী একজন, যিনি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। প্রযুক্তির উৎকর্ষের পেছনে যে নিখুঁত উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও উপাদানের মান কতটা জরুরি, তাঁর এই সাফল্য মূলত সেই সত্যেরই এক অনন্য দলিল।





























