রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল, স্বস্তির পাশে রয়েছে উদ্বেগও
- আপডেট সময় : ০৯:৪৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬৩৯ কোটি) ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের কাছে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। সাধারণত তিন মাসের আমদানি বিল মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকলেই তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হয়। গত রবিবার রিজার্ভের এই নতুন চিত্র সামনে এসেছে এবং বিগত ছয় মাসে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।
গত সপ্তাহেও দেশের রিজার্ভের পরিমাণ সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের কারণে তা কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত মেনে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট রিজার্ভের পাশাপাশি প্রকৃত রিজার্ভের হিসাবও প্রকাশ করছে, যা বিপিএম-৬ নামে পরিচিত। এই হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি (৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ডলার)। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের আগস্টে করোনা মহামারির মধ্যে দেশে রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ হয়েছিল। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রিজার্ভের অর্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং প্রকল্প, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) এবং শ্রীলঙ্কাকে ২ কোটি ডলার ঋণ দিতে ব্যবহার করে। পরবর্তীতে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়লে ডলার সংকট তীব্র হয়। ২০২৩ সালে অব্যবস্থাপনার কারণে ৮৬ টাকার ডলারের দাম ১২৮ টাকায় গিয়ে ঠেকে। পতনের আগে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও দেনা পরিশোধ পিছিয়ে দিয়ে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ রেখে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এসে বাজারভিত্তিক ডলারের দাম নির্ধারণ করলে প্রবাসী ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পায়, যার ফলে তাদের ১৮ মাসের শাসনামলে রিজার্ভ ৯ বিলিয়ন ডলার বাড়ে। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভের পতন ঠেকাতে সক্ষম হন।
নতুন রাজনৈতিক সরকার আসার পরও প্রবাসী ও রপ্তানি আয়ের এই গতি সচল রয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত টানা ছয় মাস প্রবাসীরা প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আমদানির কঠোর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করায় বর্তমানে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ডলারের দাম বাজারভিত্তিক রাখা এবং নিয়মিত তদারকির কারণে বাজার এখন স্থিতিশীল এবং ডলারের জোগান স্বাভাবিক রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে ডলার ১২৩-১২৪ টাকা এবং খোলাবাজারে ১২৬ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে।
বর্তমান রিজার্ভের কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেল ও সারের বাড়তি আমদানি খরচ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০-৭৫ ডলার থাকলেও তা এখন ৯৫ ডলারে উঠেছে। এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামও প্রতি ইউনিট ১৪-১৫ ডলার থেকে বেড়ে ২৭-২৮ ডলার হয়েছে। গত ২২ আগস্ট ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি বিল মেটাতে সরকারের অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি (৪-৫ বিলিয়ন) ডলার খরচ হয়েছে।
তবে রিজার্ভ বৃদ্ধির এই স্বস্তির আড়ালে অর্থনীতিতে কিছু দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশে বর্তমানে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির এবং ঋণপ্রবাহ কম। উদ্যোক্তাদের অনীহার কারণে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির চাহিদা কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। এছাড়া মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি সাড়ে ৬ শতাংশ এবং কাঁচামাল আমদানি ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে ডলারের ব্যবহার কম হওয়ায় রিজার্ভের অর্থ বেঁচে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ায় রিজার্ভ ভালো অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ৩-৪ বিলিয়ন ডলার খরচ এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে সামনে আমদানির চাহিদা বাড়লে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ শোধ করতে হবে। তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে চারটি বিষয়ে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন: বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবিলা করা, বিনিয়োগ চাঙ্গা হলে আমদানি সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাড়তি আমদানির চাপ সামলানো।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখন ডলারের দাম ১২৩–১২৪ টাকার মধ্যে।
গত ২২ আগস্ট ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সরকারের জ্বালানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন বা ৪০০-৫০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন যথেষ্ট রিজার্ভ না থাকলে জ্বালানি কেনা, অন্য পণ্য আমদানি এবং ঋণ পরিশোধ সম্ভব হতো না।





























