শতবর্ষী দিদির জন্য ‘গাড়ি’ চাইল ৯ বছরের তুলি, উপহার দিলেন ইউএনও
- আপডেট সময় : ০৪:৩৪:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

নিজের কোনো চাহিদা ছিল না, শুধু শতবর্ষী ও দৃষ্টিহীন দিদির চলাচলের কষ্ট দূর করতে একটি ‘গাড়ি’ বা হুইলচেয়ার চেয়েছিল ৯ বছর বয়সী শিশু তুলি পাল। মাতৃহারা ও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই শিশুর এমন সরল আবদার স্পর্শ করেছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা প্রশাসনকে। শিশুটির আকুতিতে সাড়া দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে একটি হুইলচেয়ার ও নতুন পোশাক উপহার দিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রায়পুরার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা।
গত ১৭ আগস্ট সোমবার রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে খালি গায়ে হাজির হয় তুলি। তার সঙ্গে ছিল ফুফাতো ভাই কৃষ্ণ, যার জীবনও মাতৃস্নেহহীন বেদনায় ভরা। তুলি কারও কাছ থেকে শুনেছিল যে ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ারের সহায়তা পাওয়া যায়। সেই আশা নিয়েই নিজের কোনো প্রয়োজন না ভেবে অসুস্থ দিদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের আবদার নিয়ে ছুটে আসে সে।
কার্যালয়ে ঢুকে অত্যন্ত সরল কণ্ঠে তুলি বলে, “আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন।” তার মুখে এই কথা শুনে ইউএনও মো. মাসুদ রানা তাকে কাছে ডেকে নেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। আলাপচারিতায় বেরিয়ে আসে তাদের চরম অভাব-অনটন ও বঞ্চনার গল্প। তুলি রায়পুরা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হরিপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বাবা নিরঞ্জন পাল ও ভাই মহাদেবসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে থাকে। তার বাবা পেশায় একজন জেলে এবং প্রায় তিন-চার বছর আগে তুলি তার মাকে হারিয়েছে। অন্যদিকে তার শতবর্ষী দিদি বয়সের ভারে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। দিদির এই কষ্ট দূর করতেই ছোট বয়সেই প্রশাসনের দ্বারে হাজির হয় তুলি।
দুই শিশুর জীবনের এই করুণ বাস্তবতা শুনে কার্যালয়ে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শিশুদের কথা শুনে বিন্দুমাত্র দেরি না করে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করেন ইউএনও মো. মাসুদ রানা। একই সাথে তুলি ও কৃষ্ণের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনে দেওয়া হয়। নতুন পোশাক পরে দিদির জন্য হুইলচেয়ার নিয়ে যখন বাড়ির পথে রওনা দেয় তুলি, তখন তার মুখে ছিল নির্মল আনন্দের হাসি। পরে উপজেলা প্রশাসনের কর্মীরা রিকশায় করে দুই শিশু ও হুইলচেয়ারটি তাদের হরিপুরের বাসায় পৌঁছে দেন।
এ বিষয়ে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানান, তুলি কারও কাছে শুনেছিল যে ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। সেই আশাতেই খালি গায়ে হন্তদন্ত হয়ে তার প্রতিবন্ধী দিদির জন্য ‘গাড়ি’ চাইতে চলে আসে। কথোপকথনে জানতে পারেন যে তার মা নেই এবং দিদি হাঁটতে পারেন না। তিনি বলেন, “খালি গায়ে আসা দুই শিশু যখন নতুন জামা পরে, দিদির জন্য হুইলচেয়ার নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়, তখন তাদের মুখে যে আনন্দ দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ। তুলির সেই মায়াবী হাসি কোনোদিন ভোলার নয়।”
স্থানীয়দের মতে, একটি হুইলচেয়ার হয়তো খুব বড় কোনো বিষয় নয়, কিন্তু নিজের অভাব ভুলে শতবর্ষী দিদির জন্য ৯ বছরের শিশুর করা এই মানবিক আবদারের মূল্য অনেক বেশি। অভাব-অনটনের মাঝেও যে ভালোবাসা হারিয়ে যায় না, তুলির এই গল্প যেন তারই এক সুন্দর দৃষ্টান্ত।



























