আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারে ট্রানজিট রুট এখন বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০৫:১৫:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে বন্যপ্রাণী পাচারকারী সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রটি স্থানীয় প্রজাতির পাশাপাশি আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিপন্ন প্রাণীদের পাচারের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। অভিযানে ধরা পড়লেও আইনি ফাঁকফোকরে তারা অল্প সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম করিডোরে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, আমাজন অববাহিকা কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্গম বনভূমি থেকে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী আকাশ ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। এরপর বেনাপোল, যশোর, সিলেট, হিলি ও ময়নমসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করা হয়। ভারতে ‘সাইটিস’ এবং নন-সাইটিসভুক্ত প্রাণীর বাণিজ্যিক আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ায় বাংলাদেশকেই তারা রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে।
তিন থেকে চার স্তর বিশিষ্ট সুসংগঠিত এই সিন্ডিকেটের প্রথম স্তরে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে প্রাণী সংগ্রহ করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে পাঠায়। দ্বিতীয় স্তরে ঢাকার মিরপুর ও উত্তরার মতো এলাকায় ছদ্মবেশী ক্যাটেল হাউজ বা পেটেরিয়ান ফার্মের আড়ালে দেশীয় চক্র কাজ করে। অনেক সময় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ‘বাণিজ্যিক আমদানির’ অনুমতির অপব্যবহার করা হয়। সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো সীমান্ত এলাকার ‘লাইনম্যান’ ও ক্যাডার বাহিনী, যারা প্রাণীর ওজন ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে পাচার ফি নির্ধারণ করে সীমান্ত পারাপার নিশ্চিত করে। শেষ স্তরে প্রতিবেশী দেশের ক্রেতার হাতে প্রাণীগুলো তুলে দেওয়া হয়।
এই পাচার চক্রের কারণে বাংলাদেশ থেকে ডাবল-হর্ন গন্ডার, গোলাপী মাথা হাঁস, নীলগাই, রাজশকুন এবং স্বাদুপানির কুমির ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সুন্দরবন থেকে বাঘের চামড়া ও হাড় পাচারের ফলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। বর্তমানে লজ্জাবতী বানর, এশীয় হাতি, চশমা পরা হনুমান, গুইসাপ, তক্ষক, বনরুই এবং বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ চরম হুমকির মুখে রয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২৩০টি অভিযানে ৩,১৪৫টি প্রাণী উদ্ধার হলেও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের হার নগণ্য। আর ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪১৫টি অভিযানে মোট ৮,২৮১টি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়—যার মধ্যে স্তন্যপায়ী ২৫৪টি (২৫৪ট), পাখি ৪,৭৩৫টি (৭৩৫ট), সরীসৃপ ৩,২৯০টি (২৯০ট) এবং বিরল মাছ ২টি। ২০২৪ সালের মে মাসে মিরপুরে ১,৫০০টি প্রাণী উদ্ধার, জুনে কক্সবাজারে ১২টি কচ্ছপ উদ্ধার, আগস্টে হালুয়াঘাটে লজ্জাবতী বানর উদ্ধার, নভেম্বরে বিমানবন্দরে ৮টি মেকাও ও ৪টি বিষধর সাপসহ বিদেশি নাগরিক আটক এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেনাপোলে ক্যাটেল ট্রাকে বিপুল পাখি উদ্ধারসহ মূল ‘লাইনম্যান’ আটকের ঘটনা ঘটেছে।
বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হচ্ছে এবং নেটওয়ার্ক ভাঙার কাজ চলছে। বন বিভাগের আব্দুল করিম জানান, পাচারকারীরা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অনুমতির অপব্যবহার করে। পরিবেশবাদী ফারহানা ইয়াসমিন ও ড. আনোয়ারুল ইসলাম জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান ও অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলাম ভূইয়া সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন ও প্রশাসনিক শিথিলতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অ্যাডভোকেট তৌহিদ বিশ্বাস আইন সংশোধন করে পাচারকে অ-জামিনযোগ্য করার পরামর্শ দিয়েছেন।



























