ঢাকা ০১:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক: প্রেস কাউন্সিল ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে একদিনে গ্রেপ্তার ৪৬৫, মামলা ৭৩ কয়রার যোগাযোগ সংকট কাটাতে ৬০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ দেশে ২ কোটি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা, লক্ষ্য আরও ৩৫ লাখ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি ভাঙ্গুড়ায় নৈশ প্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সিসিটিভিতে ধরা পড়ল প্রিজন ভ্যান থেকে পিচ্চি রাজার পালানোর দৃশ্য বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শহীদ মনোযোগের রাশ কার হাতে, আপনার নাকি ফোনের স্ক্রিনের? যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে কার্যকর হবে সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ড

দেশে খোস-পাঁচড়ার আশঙ্কাজনক প্রাদুর্ভাব, নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



দেশে স্ক্যাবিস বা খোস-পাঁচড়ার প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ একাডেমি অব ডার্মাটোলজি বর্তমানে এটিকে একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সিলেট, কুমিল্লা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের প্রায় সব জেলা থেকেই এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অতি ক্ষুদ্র পরজীবী 'সারকোপটস স্ক্যাবিআই' (Sarcoptes scabiei)-এর কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে। এই পরজীবীটি ত্বকের নিচে সুড়ঙ্গ তৈরি করে ডিম পাড়ে, যার ফলে শরীরে তীব্র চুলকানি ও প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন আবাসিক হোস্টেল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রোগের সংক্রমণের হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। কেবল সিলেট অঞ্চলেই গত আড়াই মাসে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ এই রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। এমনকি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও এই রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সমন্বিত চিকিৎসা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই রোগ বাড়ার পেছনে বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ঘনবসতি ও পারস্পরিক সংস্পর্শ। একই ঘরে একাধিক মানুষের বসবাস এবং একই বিছানা, তোয়ালে বা পোশাক ভাগাভাগি করে ব্যবহারের কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, ভুল ও অসম্পূর্ণ চিকিৎসা। বাজারে প্রচলিত বেটনোভেইট (Betnovate) বা ডারমোভেইট (Dermovate)-এর মতো স্টেরয়েড মিশ্রিত মলমের অবাধ ব্যবহার সাময়িকভাবে চুলকানি কমালেও পরজীবী ধ্বংস করতে পারে না। ফলে রোগটি চাপা পড়ে আরও বিস্তার লাভ করে। এছাড়া সচেতনতার অভাব এবং পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে সবার চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে সুস্থ ব্যক্তিরা বারবার পুনরায় সংক্রমিত হচ্ছেন। অনেকেই আবার এটিকে সাধারণ অ্যালার্জি মনে করে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন।

খোস-পাঁচড়ার প্রধান লক্ষণ হলো রাতে তীব্র চুলকানি বৃদ্ধি পাওয়া। সাধারণত আঙুলের ফাঁকে, কব্জিতে, বগলে, কোমরে, নাভির চারপাশে এবং যৌনাঙ্গের আশেপাশে ছোট ছোট লাল দানা ও পানিযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো মাথা ও পায়ের তলাতেও প্রকাশ পেতে পারে। পরিবারে একাধিক সদস্যের একই ধরনের চুলকানি থাকলে স্ক্যাবিস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। এই সংক্রমণ অবহেলা করলে চামড়ায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, পুঁজযুক্ত ঘা এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনির প্রদাহের মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই রোগ প্রতিরোধে আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবারের লক্ষণহীন সদস্যদেরও একই দিনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, এর প্রধান ও প্রমাণিত চিকিৎসা হলো ৫% পারমেথ্রিন ক্রিম, যা সঠিক নিয়মে গলা থেকে পা পর্যন্ত ব্যবহার করতে হয়। প্রয়োজনে এক সপ্তাহ পর দ্বিতীয়বার এটি প্রয়োগ করতে হতে পারে। এছাড়া বিকল্প হিসেবে বেনজাইল বেনজোয়েট লোশন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ওষুধও চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা যায়।

আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জামা-কাপড়, বিছানার চাদর ও তোয়ালে অন্তত ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকাতে হবে এবং ইস্ত্রি করে ব্যবহার করতে হবে। যেসব জিনিসপত্র ধোয়া সম্ভব নয়, সেগুলো চার দিন পলিথিন ব্যাগে শক্ত করে বেঁধে রাখলে পরজীবীগুলো মারা যায়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নখ ছোট রাখা এবং প্রতিদিন গোসল করা জরুরি। ওষুধ ব্যবহারের পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত চুলকানি থাকা স্বাভাবিক, তাই বারবার ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। তবে পুঁজ হওয়া, জ্বর আসা কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

বারডেম মহিলা ও শিশু হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. অমৃত লাল হালদার জানান, কেবল ব্যক্তিগত চিকিৎসায় এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। স্কুল, মাদ্রাসা ও আবাসিক হোস্টেলগুলোতে নিয়মিত স্ক্রিনিং করা, ফার্মেসিতে স্টেরয়েড মলম বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা এবং উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

যা ধোয়া সম্ভব নয়, তা ৪ দিন পলিথিন ব্যাগে বেঁধে রাখলে পরজীবী মারা যায়।

ওষুধ প্রয়োগের পরও ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত চুলকানি থাকতে পারে, এটি স্বাভাবিক।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

নিউজটি শেয়ার করুন

দেশে খোস-পাঁচড়ার আশঙ্কাজনক প্রাদুর্ভাব, নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

আপডেট সময় : ১১:১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

দেশে স্ক্যাবিস বা খোস-পাঁচড়ার প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ একাডেমি অব ডার্মাটোলজি বর্তমানে এটিকে একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সিলেট, কুমিল্লা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের প্রায় সব জেলা থেকেই এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অতি ক্ষুদ্র পরজীবী 'সারকোপটস স্ক্যাবিআই' (Sarcoptes scabiei)-এর কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে। এই পরজীবীটি ত্বকের নিচে সুড়ঙ্গ তৈরি করে ডিম পাড়ে, যার ফলে শরীরে তীব্র চুলকানি ও প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন আবাসিক হোস্টেল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রোগের সংক্রমণের হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। কেবল সিলেট অঞ্চলেই গত আড়াই মাসে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ এই রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। এমনকি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও এই রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সমন্বিত চিকিৎসা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই রোগ বাড়ার পেছনে বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ঘনবসতি ও পারস্পরিক সংস্পর্শ। একই ঘরে একাধিক মানুষের বসবাস এবং একই বিছানা, তোয়ালে বা পোশাক ভাগাভাগি করে ব্যবহারের কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, ভুল ও অসম্পূর্ণ চিকিৎসা। বাজারে প্রচলিত বেটনোভেইট (Betnovate) বা ডারমোভেইট (Dermovate)-এর মতো স্টেরয়েড মিশ্রিত মলমের অবাধ ব্যবহার সাময়িকভাবে চুলকানি কমালেও পরজীবী ধ্বংস করতে পারে না। ফলে রোগটি চাপা পড়ে আরও বিস্তার লাভ করে। এছাড়া সচেতনতার অভাব এবং পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে সবার চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে সুস্থ ব্যক্তিরা বারবার পুনরায় সংক্রমিত হচ্ছেন। অনেকেই আবার এটিকে সাধারণ অ্যালার্জি মনে করে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন।

খোস-পাঁচড়ার প্রধান লক্ষণ হলো রাতে তীব্র চুলকানি বৃদ্ধি পাওয়া। সাধারণত আঙুলের ফাঁকে, কব্জিতে, বগলে, কোমরে, নাভির চারপাশে এবং যৌনাঙ্গের আশেপাশে ছোট ছোট লাল দানা ও পানিযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো মাথা ও পায়ের তলাতেও প্রকাশ পেতে পারে। পরিবারে একাধিক সদস্যের একই ধরনের চুলকানি থাকলে স্ক্যাবিস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। এই সংক্রমণ অবহেলা করলে চামড়ায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, পুঁজযুক্ত ঘা এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনির প্রদাহের মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই রোগ প্রতিরোধে আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবারের লক্ষণহীন সদস্যদেরও একই দিনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, এর প্রধান ও প্রমাণিত চিকিৎসা হলো ৫% পারমেথ্রিন ক্রিম, যা সঠিক নিয়মে গলা থেকে পা পর্যন্ত ব্যবহার করতে হয়। প্রয়োজনে এক সপ্তাহ পর দ্বিতীয়বার এটি প্রয়োগ করতে হতে পারে। এছাড়া বিকল্প হিসেবে বেনজাইল বেনজোয়েট লোশন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ওষুধও চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা যায়।

আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জামা-কাপড়, বিছানার চাদর ও তোয়ালে অন্তত ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকাতে হবে এবং ইস্ত্রি করে ব্যবহার করতে হবে। যেসব জিনিসপত্র ধোয়া সম্ভব নয়, সেগুলো চার দিন পলিথিন ব্যাগে শক্ত করে বেঁধে রাখলে পরজীবীগুলো মারা যায়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নখ ছোট রাখা এবং প্রতিদিন গোসল করা জরুরি। ওষুধ ব্যবহারের পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত চুলকানি থাকা স্বাভাবিক, তাই বারবার ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। তবে পুঁজ হওয়া, জ্বর আসা কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

বারডেম মহিলা ও শিশু হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. অমৃত লাল হালদার জানান, কেবল ব্যক্তিগত চিকিৎসায় এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। স্কুল, মাদ্রাসা ও আবাসিক হোস্টেলগুলোতে নিয়মিত স্ক্রিনিং করা, ফার্মেসিতে স্টেরয়েড মলম বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা এবং উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

যা ধোয়া সম্ভব নয়, তা ৪ দিন পলিথিন ব্যাগে বেঁধে রাখলে পরজীবী মারা যায়।

ওষুধ প্রয়োগের পরও ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত চুলকানি থাকতে পারে, এটি স্বাভাবিক।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh