ঢাকা ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাংলাদেশে বিরোধী দলের সমর্থকদের গণগ্রেপ্তারের অভিযোগ এইচআরডব্লিউর নাইজেরিয়ায় সামরিক বিমান বিধ্বস্ত: ৩২ আরোহীর সবাই নিহত ‘যাযাবর’ সিনেমার শুটিংয়ে অ্যাকশন দৃশ্যে আহত অভিনেতা ওমর মালিক ওয়াহাজ-ইয়ুমনার ‘তেরে বিন ২’ নিয়ে শুটিংয়ের নতুন খবর রংপুরে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপিত, মর্যাদা রক্ষার আহ্বান আবরার হত্যা মামলা: আপিল নিষ্পত্তিতে আরও ৫ বছর লাগার শঙ্কা ৪২ জেলায় ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানে ১১৯ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা সিরাজগঞ্জে বাবার লাঠির আঘাতে ৯ মাসের শিশুর মৃত্যু ‘ঘুষ খাওয়ার জন্যই পোশাক লাগিয়েছি’, চুনারুঘাটের এএসআইয়ের ভিডিও ভাইরাল মেসির বিদায়ী ম্যাচে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ

ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সহিংসতা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০১:৩৩:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সাম্প্রতিক হামলা ক্যাম্পাসে সহিংসতার এক পুরোনো ও উদ্বেগজনক চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চালানো এই হামলায় চারজন সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যর্থতা স্বীকার করা হয়েছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়ে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এই ধরনের সহিংসতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনার পর প্রক্টর নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি। কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) জানিয়েছেন যে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় মামলা করা হবে। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া একই ধরনের সহিংসতার ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তদন্ত কমিটি গঠন বা সাময়িক বরখাস্তের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানোর মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল ক্যাম্পাসগুলোকে সহিংসতামুক্ত করা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তা থেকেই এই অভ্যুত্থানের সূত্রপাত। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের এমন aggression বা আগ্রাসী ভূমিকা সাধারণ মানুষের মনে সেই পুরোনো ও তিক্ত স্মৃতিকেই নতুন করে উসকে দিচ্ছে। কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, এর আগেও গত এপ্রিল মাসে রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রদলের হামলায় ১০ জন সাংবাদিক আহত হয়েছিলেন। এছাড়া গত মার্চে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয় দখলচেষ্টার সময়ও ১০ জন সাংবাদিক আহত হন।

সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের এই প্রবণতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী, ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানেও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ আগস্ট ঝিনাইদহে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সাংবাদিক ছাত্রদলের হামলার শিকার হন। একইভাবে ২৫ আগস্ট শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিএনপির কর্মসূচি চলাকালে তিন সাংবাদিক মারধরের শিকার হন। আবার গত ২৩ জুন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জামায়াতের মিছিল শেষে এক সাংবাদিককে মারধর করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর এই ধরনের অসহনশীলতা ও আক্রমণাত্মক আচরণ গণমাধ্যমের কর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পরও প্রশাসন ও দলের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদনগুলো কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি শাহবাগ থানার সেই ঘটনায় পুলিশ কোনো মামলাও নেয়নি। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল সাময়িক বহিষ্কার বা কারণ দর্শানোর নোটিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এই ধরনের অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে। লেখক ও গবেষক সহুল আহমদের মতে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্রদলের শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ক্যাম্পাসের এই সহিংস পরিবেশ রুখতে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে কেবল দলীয় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ফৌজদারি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সহিংসতা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট সময় : ০১:৩৩:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সাম্প্রতিক হামলা ক্যাম্পাসে সহিংসতার এক পুরোনো ও উদ্বেগজনক চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চালানো এই হামলায় চারজন সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যর্থতা স্বীকার করা হয়েছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়ে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এই ধরনের সহিংসতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনার পর প্রক্টর নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি। কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) জানিয়েছেন যে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় মামলা করা হবে। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া একই ধরনের সহিংসতার ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তদন্ত কমিটি গঠন বা সাময়িক বরখাস্তের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানোর মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল ক্যাম্পাসগুলোকে সহিংসতামুক্ত করা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তা থেকেই এই অভ্যুত্থানের সূত্রপাত। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের এমন aggression বা আগ্রাসী ভূমিকা সাধারণ মানুষের মনে সেই পুরোনো ও তিক্ত স্মৃতিকেই নতুন করে উসকে দিচ্ছে। কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, এর আগেও গত এপ্রিল মাসে রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রদলের হামলায় ১০ জন সাংবাদিক আহত হয়েছিলেন। এছাড়া গত মার্চে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয় দখলচেষ্টার সময়ও ১০ জন সাংবাদিক আহত হন।

সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের এই প্রবণতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী, ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানেও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ আগস্ট ঝিনাইদহে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সাংবাদিক ছাত্রদলের হামলার শিকার হন। একইভাবে ২৫ আগস্ট শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিএনপির কর্মসূচি চলাকালে তিন সাংবাদিক মারধরের শিকার হন। আবার গত ২৩ জুন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জামায়াতের মিছিল শেষে এক সাংবাদিককে মারধর করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর এই ধরনের অসহনশীলতা ও আক্রমণাত্মক আচরণ গণমাধ্যমের কর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পরও প্রশাসন ও দলের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদনগুলো কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি শাহবাগ থানার সেই ঘটনায় পুলিশ কোনো মামলাও নেয়নি। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল সাময়িক বহিষ্কার বা কারণ দর্শানোর নোটিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এই ধরনের অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে। লেখক ও গবেষক সহুল আহমদের মতে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্রদলের শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ক্যাম্পাসের এই সহিংস পরিবেশ রুখতে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে কেবল দলীয় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ফৌজদারি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo