ঢাকা ০৪:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাজেকের পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার নির্দেশ, বাধা নেই ভ্রমণে সারাদেশে পূজা উদযাপনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে এনসিপি: নাহিদ ইসলাম কুমিল্লা সীমান্তে বিএসএফের হাতে আটক দুই পুলিশ সদস্য ইয়েমেনের আল-মাশিক প্রাসাদে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: নিহত ২ পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে জবিতে গরু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মিছিল মেসি পরবর্তী যুগে আর্জেন্টিনার পরবর্তী দুই প্রতিপক্ষ কারা সাতক্ষীরায় ফেসবুক লাইভ করে যুবককে পিটিয়ে হত্যা গাজীপুরে রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে মাদক কারবারিদের হামলা, আহত ২ নোবিপ্রবির পুরো ক্যাম্পাস সৌরবিদ্যুৎ চালুর পরিকল্পনা প্রতি তিন মাস পর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির তথ্য নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক রূপান্তর

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৯:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যুক্তরাজ্যের বাজারে বর্তমানে ৯৯.৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া এবং এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পরও এর বড় একটি অংশ বহাল থাকার ঘোষণা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে কেবল এই শুল্কছাড়ই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের অবস্থান নির্ধারণে অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব এখন এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিশ্বায়নের জায়গা দখল করছে কৌশলগত অর্থনীতি। আগে ব্যবসা ও রাজনীতি সমান্তরাল চললেও বর্তমানে তারা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বাজারের উন্মুক্ততা এমনকি প্রযুক্তির প্রবাহ এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এলডিসি-পরবর্তী পৃথিবীতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাখা। বিশেষ সুবিধা শেষ হলেও প্রতিযোগিতা শেষ হবে না, বরং বাজার দখলের লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরতা আর নিরাপদ কৌশল নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ শিল্প এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানিপণ্যের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ যদি শ্রমঘন শিল্পের প্রাথমিক সুবিধার ওপর আটকে থাকে, তবে ভবিষ্যতে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। এলডিসি উত্তরণ তাই কেবল অর্থনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন নয়, এটি একটি নতুন অর্থনৈতিক মানসিকতার দাবি রাখে।

একই সাথে কৌশলগত কূটনীতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক শক্তির আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নতুন হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে গুরুত্ব পাওয়া আর সেটিকে কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। ঢাকার কূটনীতির বড় শক্তি ছিল ভারসাম্য বজায় রাখা, যেখানে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে জটিল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা হয়েছে। আগামী দিনে এই ভারসাম্য রক্ষাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ, কারণ বর্তমান বিশ্বে মিত্রতা নয়, স্বার্থই স্থায়ী।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ভারত দ্রুত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, পাকিস্তান দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তায় রয়েছে এবং শ্রীলঙ্কা ঋণসংকট থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দক্ষ কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ অঞ্চলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

আগামী পৃথিবীর নিরাপত্তা কেবল অর্থনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকট নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। রোহিঙ্গা সংকট এর বড় উদাহরণ, যা দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সংকটের শিকার হলেও অভিযোজন সক্ষমতায় বিশ্বে একটি সফল উদাহরণ। তাই জলবায়ু কূটনীতিকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

পরিশেষে, যুক্তরাজ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধার ঘোষণাকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে না দেখে এটিকে একটি সুযোগের জানালা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বহুমুখী অর্থনীতি এবং প্রভাবশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের লক্ষ্য। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে স্থায়ী বন্ধু বা প্রতিপক্ষ নেই, আছে কেবল জাতীয় স্বার্থ; আর তা রক্ষায় অর্থনৈতিক শক্তি ও দূরদর্শী কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।

কারণ ২১ শতকের বিশ্বে শুধু শুল্কছাড় কোনো দেশের উন্নয়নের গ্যারান্টি নয়; বরং অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বিত শক্তিই নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অবস্থান।বিশ্ব এখন এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

নিউজটি শেয়ার করুন

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক রূপান্তর

আপডেট সময় : ০৯:৪৯:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাজ্যের বাজারে বর্তমানে ৯৯.৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া এবং এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পরও এর বড় একটি অংশ বহাল থাকার ঘোষণা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে কেবল এই শুল্কছাড়ই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের অবস্থান নির্ধারণে অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব এখন এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিশ্বায়নের জায়গা দখল করছে কৌশলগত অর্থনীতি। আগে ব্যবসা ও রাজনীতি সমান্তরাল চললেও বর্তমানে তারা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বাজারের উন্মুক্ততা এমনকি প্রযুক্তির প্রবাহ এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এলডিসি-পরবর্তী পৃথিবীতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাখা। বিশেষ সুবিধা শেষ হলেও প্রতিযোগিতা শেষ হবে না, বরং বাজার দখলের লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরতা আর নিরাপদ কৌশল নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ শিল্প এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানিপণ্যের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ যদি শ্রমঘন শিল্পের প্রাথমিক সুবিধার ওপর আটকে থাকে, তবে ভবিষ্যতে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। এলডিসি উত্তরণ তাই কেবল অর্থনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন নয়, এটি একটি নতুন অর্থনৈতিক মানসিকতার দাবি রাখে।

একই সাথে কৌশলগত কূটনীতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক শক্তির আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নতুন হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে গুরুত্ব পাওয়া আর সেটিকে কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। ঢাকার কূটনীতির বড় শক্তি ছিল ভারসাম্য বজায় রাখা, যেখানে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে জটিল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা হয়েছে। আগামী দিনে এই ভারসাম্য রক্ষাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ, কারণ বর্তমান বিশ্বে মিত্রতা নয়, স্বার্থই স্থায়ী।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ভারত দ্রুত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, পাকিস্তান দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তায় রয়েছে এবং শ্রীলঙ্কা ঋণসংকট থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দক্ষ কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ অঞ্চলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

আগামী পৃথিবীর নিরাপত্তা কেবল অর্থনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকট নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। রোহিঙ্গা সংকট এর বড় উদাহরণ, যা দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সংকটের শিকার হলেও অভিযোজন সক্ষমতায় বিশ্বে একটি সফল উদাহরণ। তাই জলবায়ু কূটনীতিকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

পরিশেষে, যুক্তরাজ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধার ঘোষণাকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে না দেখে এটিকে একটি সুযোগের জানালা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বহুমুখী অর্থনীতি এবং প্রভাবশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের লক্ষ্য। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে স্থায়ী বন্ধু বা প্রতিপক্ষ নেই, আছে কেবল জাতীয় স্বার্থ; আর তা রক্ষায় অর্থনৈতিক শক্তি ও দূরদর্শী কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।

কারণ ২১ শতকের বিশ্বে শুধু শুল্কছাড় কোনো দেশের উন্নয়নের গ্যারান্টি নয়; বরং অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বিত শক্তিই নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অবস্থান।বিশ্ব এখন এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin