কোলাহলের মাঝেও নির্জনতা ধরে রেখেছে মৌলভীবাজারের বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক
- আপডেট সময় : ০৯:০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

চারপাশে গ্রাম, ঘরবাড়ি আর শহরের চেনা কোলাহল। কিন্তু তার ঠিক মাঝখানেই নিজের মতো করে নির্জনতা ধরে রেখেছে এক চিরহরিৎ বনাঞ্চল। মৌলভীবাজার সদর উপজেলা শহর থেকে মাত্র দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত এই বনের নাম ‘বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক’। ছোট ছোট টিলায় ঘেরা এই বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে পিচঢালা সড়ক, যার দুপাশে কোথাও ঘন আবার কোথাও হালকা গাছপালা। দিনদুপুরেও বনের নিবিড় ছায়ায় ঢাকা থাকে এই সড়ক, আর সেই ছায়া মাড়িয়েই ছুটে চলে বিভিন্ন যানবাহন।
শত বছরের পুরনো এই বনের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ১৯১৬ সালে প্রথম এটিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ৮৮৭ একর আয়তনের এই প্রাকৃতিক বনটিকে সরকার ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণা করে। বনজুড়ে কোথাও ঘন পাতার ছায়া, আবার কোথাও পাতার ফাঁক গলে রোদের ঝিলিক। বনের নির্জনতার বুক চিরে মাঝেমধ্যে ভেসে আসে পাখির ডাক আর বন্য প্রাণীর মৃদু আওয়াজ।
সম্প্রতি এক দুপুরে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের পাশ দিয়ে কালেঙ্গার দিকে যাওয়ার পথে চারপাশের দৃশ্যপটে এক দারুণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সড়ক ধরে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে গাছের ছায়া আরও ঘন হতে থাকে। একটি নির্দিষ্ট মোড়ে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে বর্ষিজোড়া ইকোপার্কের প্রবেশ তোরণ। কংক্রিটের তৈরি দুটি হরিণ, ওপরে বানর ও ইগলের ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো এই তোরণটিতে এখন সময়ের ছাপ স্পষ্ট। তোরণের গায়ে শেওলা জমে ‘বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, মৌলভীবাজার’ লেখাটি প্রায় ঢেকে গেছে।
তোরণ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা যায় বনের বুক চিরে চলে গেছে ইটবিছানো সরু পথ। এই পথের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে শাল, গর্জন, শিমুল, বনাক, সেগুন, জারুল, চিকরাশি, বহেড়া, আমলকী ও লোহাকাঠসহ হরেক রকমের গাছপালা। বনের আরও গভীরে গেলে ছায়ার ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং চারপাশটা গভীর সবুজে ঢেকে যায়। দুপুরের নিস্তব্ধতার কারণে স্থানীয় দু-একজন সাধারণ মানুষ ছাড়া খুব বেশি মানুষের চলাচল চোখে পড়ে না। বনের ভেতরে ছোট কয়েকটি পাহাড়ি ছড়া বা খাল রয়েছে, যেগুলোতে শুষ্ক সময়ে পানি থাকে না। তবে বর্ষার সময় হয়তো এগুলোতে পানির ধারা প্রবাহিত হয়। ফেরার পথে বনের ছোট ছোট গাছের ফাঁকে গোলাপি রঙের বুনো আদা ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়, যা সবুজের মাঝে এক পশলা নান্দনিকতা ছড়িয়ে দেয়।
এই বনে একসময় বানর, হনুমান, শিয়াল, মেছো বাঘ, উদ্বিড়াল, কাঠবিড়ালি, সজারু, বেজি, বনরুই, গুইসাপ, খরগোশ এবং বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বাস ছিল বলে জানা যায়। তবে বর্তমানে এসব প্রাণীর কতটি টিকে আছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বনের ভেতরে এখনো ঘুঘু, শালিক, টিয়া, বাবুই, বক, দোয়েল, ফিঙে, মাছরাঙা, চিল ও কাঠঠোকরাসহ নানা জাতের পাখির দেখা মেলে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই বনের প্রাণবৈচিত্র্যেও বড় ধরনের বদল এসেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, অতীতে এখানে চিতাবাঘ, মায়াহরিণ ও উল্লুকের মতো বন্য প্রাণীর বিচরণ ছিল, যা এখন আর একেবারেই দেখা যায় না। বনের সীমানা ঘেঁষে মানুষের বসতি ও পাকা ঘরবাড়ি গড়ে ওঠায় এবং মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্য প্রাণীদের বিচরণ সংকুচিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও কোলাহলের খুব কাছে থেকে গাছপালা, পাখি আর বুনো ফুলেরা এখনো মানুষের অকৃত্রিম প্রতিবেশী হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।


























