ঢাকা ০৬:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সিগারেটের নতুন খুচরা মূল্য নির্ধারণ: ৬৫ থেকে ২১০ টাকা ভারতের উত্তর প্রদেশে বন্যা ও ভূমিধসে নিহত ৫৬ হাফপ্যান্ট পরায় অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে মেট্রোস্টেশনে হেনস্তা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা অগ্রহণযোগ্য, মন্তব্য রাশিয়ার ভালো কিংবা মন্দ, সরকারের পাঁচ বছরের ‘চুক্তি’ মেনেই ধৈর্য ধরার পরামর্শ প্রতিবাদ ও ‘আগের ১৪ বছর’ বিতর্ক: একটি সামাজিক বিশ্লেষণ রাড্ডা ক্লিনিকে হামলায় ওসির অবহেলার প্রমাণ, ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শাহজালাল বিমানবন্দরে ২৮ লাখ টাকার সিরিঞ্জসহ নারী যাত্রী আটক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ শিক্ষার্থী পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেন আইনমন্ত্রী

রাঙ্গুনিয়ার ১৭ কোটি টাকার কেব্‌ল কার: ২ বছর ধরে ধ্বংসস্তূপ, নেই মেরামতের অর্থ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১০:০৭:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের প্রধান আকর্ষণ, প্রায় ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেব্‌ল কারটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হওয়ার পর থেকে এটি বন্ধ রয়েছে। মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এর সচল হওয়ার প্রক্রিয়া থমকে আছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কের প্রবেশপথের ডান পাশে অবস্থিত কেব্‌ল কারের প্রথম স্টেশনটি ভাঙচুরের স্পষ্ট চিহ্ন বহন করছে। একসময় দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরিত টিকিট কাউন্টার, অভ্যর্থনাকক্ষ, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, শৌচাগার ও জেনারেটর কক্ষ সবই এখন ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। সাতটি কেবিনের সব কটির কাচ ভাঙা এবং ভেতরের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি উধাও। কক্ষগুলোর ভেতরে ভাঙা কাচ, আবর্জনা ও লোহার বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যার মধ্যে কিছু ভারী যন্ত্রও ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

প্রথম স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে দ্বিতীয় স্টেশনে পৌঁছালেও একই চিত্র চোখে পড়ে। সেখানে আরও পাঁচটি ভাঙা কেবিন পড়ে আছে এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষের ভেতরে দুটি ভারী যন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পার্কের কর্মচারীরা জানান, ভারী ওজন হওয়ায় লুটপাটকারীরা কেবিন ও কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে যেতে পারেনি, সেগুলো কেবল ভাঙচুর করে ফেলে রাখা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৭ আগস্ট টানা তিন দিন ধরে পার্কে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় এবং ট্রাকে করে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো প্রথম আলোকে জানান, কেব্‌ল কারটি মেরামত করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করতে প্রথমে বিদেশ থেকে অভিজ্ঞ কারিগরি দল আনতে হবে এবং এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হবে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এই প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। বন বিভাগের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী, পুরো পার্কে প্রায় ৫ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কেব্‌ল কারের দুই স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাতেই প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়; প্রথম বা লোয়ার স্টেশনে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় বা আপার স্টেশনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষতি ধরা হয়েছে। মোটর, ব্রেক, সার্কিট বোর্ডসহ বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম ধ্বংস ও লুট হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের দক্ষিণ নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে প্রায় ২১০ হেক্টর বা ৫২০ একর আয়তনের এই পার্কটি অবস্থিত। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথম পর্যায়ে ৪০ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে এটি গড়ে তোলা হয় এবং ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয়। দেশি-বিদেশি পাখির আবাসস্থল, খাঁচা ও জলাধারের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল।

এই প্রকল্পের অন্যতম বড় স্থাপনা ছিল কেব্‌ল কার, যার নির্মাণকাজ ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠান এটি স্থাপন করেছিল এবং স্থানীয় কারিগরি কর্মীদের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মোহাম্মদ সাঈদ সাকলাইন প্রথম আলোকে জানান, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সরকারি কেব্‌ল কার ছিল এবং অন্য কোনো সরকারি পার্কে এত দীর্ঘ কেব্‌ল কার নেই। যাওয়া-আসা মিলিয়ে কেব্‌ল কারটির যাত্রাপথ প্রায় ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার ছিল, যা বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সের কেব্‌ল কারের (প্রায় ৪৮৮ মিটার) প্রায় পাঁচ গুণ। এটি সর্বোচ্চ ২০টি কেবিন চালানোর উপযোগী করে তৈরি করা হলেও, কেবিন ছিল ১২টি, প্রতিটিতে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রী উঠতে পারতেন। কোনো কোনো জায়গায় মাটি থেকে প্রায় ১০০ ফুট ওপর দিয়ে চলত কেব্‌ল কারটি, যেখান থেকে পাহাড়, বন আর জলাধার দেখা যেত।

তবে উদ্বোধনের পর বেশি দিন সচল থাকেনি কেব্‌ল কারটি। চালুর মাত্র দুই মাসের মাথায় দ্বিতীয় বা আপার স্টেশনের একটি পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে যাওয়ায় ঝুঁকির কারণে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর আবার দর্শনার্থীদের জন্য চালু হলেও ২০২১ সালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর পর মেরামত করে ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এটি আবার চালু করা হয়, যা প্রায় ১১ মাস সচল ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের ভাঙচুর ও লুটপাটের পর এটি আবারও বন্ধ হয়ে যায়।

পার্কসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, কেব্‌ল কার সচল থাকার সময় দিনে সাধারণত ৪০০ থেকে ৭০০ দর্শনার্থী চড়তেন। উৎসব ও ছুটির দিনে এই সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেত। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যাওয়া-আসার টিকিট ছিল ২৩০ টাকা এবং ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ১১৫ টাকা। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল জব্বার বলেন, কেব্‌ল কার চালু থাকলে পার্কে দর্শনার্থীর সমাগম বেড়ে যায় এবং এটি বন্ধ থাকায় পার্কের আকর্ষণও কমেছে।

এর মধ্যে বন বিভাগ পার্কটি আরও সম্প্রসারণে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এর আওতায় পাখির আবাসস্থল, পর্যটকদের বসার শেড, হ্রদ ঘিরে অবকাঠামো, নিরাপত্তাচৌকি, পানি সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেব্‌ল কারের পথ বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল, তবে পরে সেই পরিকল্পনা থেকে বন বিভাগ সরে আসে। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী দুই বছরের বেশি সময় ধরে অচল কেব্‌ল কারটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “অতীতে পার্কের কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে এখন সব কাজ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হবে। পার্কটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রধান আকর্ষণ কেব্‌ল কারটিও সংস্কার করা হবে।”

তারপর পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতেন অন্য প্রান্তে।এখন সেই স্টেশনজুড়ে ভাঙচুরের চিহ্ন।

২০১০ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া ওই কেব্‌ল কারের যাওয়া-আসার পথ প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট বা ৪৮৮ মিটার।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

রাঙ্গুনিয়ার ১৭ কোটি টাকার কেব্‌ল কার: ২ বছর ধরে ধ্বংসস্তূপ, নেই মেরামতের অর্থ

আপডেট সময় : ১০:০৭:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের প্রধান আকর্ষণ, প্রায় ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেব্‌ল কারটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হওয়ার পর থেকে এটি বন্ধ রয়েছে। মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এর সচল হওয়ার প্রক্রিয়া থমকে আছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কের প্রবেশপথের ডান পাশে অবস্থিত কেব্‌ল কারের প্রথম স্টেশনটি ভাঙচুরের স্পষ্ট চিহ্ন বহন করছে। একসময় দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরিত টিকিট কাউন্টার, অভ্যর্থনাকক্ষ, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, শৌচাগার ও জেনারেটর কক্ষ সবই এখন ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। সাতটি কেবিনের সব কটির কাচ ভাঙা এবং ভেতরের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি উধাও। কক্ষগুলোর ভেতরে ভাঙা কাচ, আবর্জনা ও লোহার বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যার মধ্যে কিছু ভারী যন্ত্রও ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

প্রথম স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে দ্বিতীয় স্টেশনে পৌঁছালেও একই চিত্র চোখে পড়ে। সেখানে আরও পাঁচটি ভাঙা কেবিন পড়ে আছে এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষের ভেতরে দুটি ভারী যন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পার্কের কর্মচারীরা জানান, ভারী ওজন হওয়ায় লুটপাটকারীরা কেবিন ও কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে যেতে পারেনি, সেগুলো কেবল ভাঙচুর করে ফেলে রাখা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৭ আগস্ট টানা তিন দিন ধরে পার্কে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় এবং ট্রাকে করে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো প্রথম আলোকে জানান, কেব্‌ল কারটি মেরামত করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করতে প্রথমে বিদেশ থেকে অভিজ্ঞ কারিগরি দল আনতে হবে এবং এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হবে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এই প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। বন বিভাগের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী, পুরো পার্কে প্রায় ৫ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কেব্‌ল কারের দুই স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাতেই প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়; প্রথম বা লোয়ার স্টেশনে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় বা আপার স্টেশনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষতি ধরা হয়েছে। মোটর, ব্রেক, সার্কিট বোর্ডসহ বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম ধ্বংস ও লুট হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের দক্ষিণ নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে প্রায় ২১০ হেক্টর বা ৫২০ একর আয়তনের এই পার্কটি অবস্থিত। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথম পর্যায়ে ৪০ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে এটি গড়ে তোলা হয় এবং ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয়। দেশি-বিদেশি পাখির আবাসস্থল, খাঁচা ও জলাধারের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল।

এই প্রকল্পের অন্যতম বড় স্থাপনা ছিল কেব্‌ল কার, যার নির্মাণকাজ ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠান এটি স্থাপন করেছিল এবং স্থানীয় কারিগরি কর্মীদের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মোহাম্মদ সাঈদ সাকলাইন প্রথম আলোকে জানান, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সরকারি কেব্‌ল কার ছিল এবং অন্য কোনো সরকারি পার্কে এত দীর্ঘ কেব্‌ল কার নেই। যাওয়া-আসা মিলিয়ে কেব্‌ল কারটির যাত্রাপথ প্রায় ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার ছিল, যা বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সের কেব্‌ল কারের (প্রায় ৪৮৮ মিটার) প্রায় পাঁচ গুণ। এটি সর্বোচ্চ ২০টি কেবিন চালানোর উপযোগী করে তৈরি করা হলেও, কেবিন ছিল ১২টি, প্রতিটিতে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রী উঠতে পারতেন। কোনো কোনো জায়গায় মাটি থেকে প্রায় ১০০ ফুট ওপর দিয়ে চলত কেব্‌ল কারটি, যেখান থেকে পাহাড়, বন আর জলাধার দেখা যেত।

তবে উদ্বোধনের পর বেশি দিন সচল থাকেনি কেব্‌ল কারটি। চালুর মাত্র দুই মাসের মাথায় দ্বিতীয় বা আপার স্টেশনের একটি পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে যাওয়ায় ঝুঁকির কারণে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর আবার দর্শনার্থীদের জন্য চালু হলেও ২০২১ সালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর পর মেরামত করে ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এটি আবার চালু করা হয়, যা প্রায় ১১ মাস সচল ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের ভাঙচুর ও লুটপাটের পর এটি আবারও বন্ধ হয়ে যায়।

পার্কসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, কেব্‌ল কার সচল থাকার সময় দিনে সাধারণত ৪০০ থেকে ৭০০ দর্শনার্থী চড়তেন। উৎসব ও ছুটির দিনে এই সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেত। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যাওয়া-আসার টিকিট ছিল ২৩০ টাকা এবং ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ১১৫ টাকা। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল জব্বার বলেন, কেব্‌ল কার চালু থাকলে পার্কে দর্শনার্থীর সমাগম বেড়ে যায় এবং এটি বন্ধ থাকায় পার্কের আকর্ষণও কমেছে।

এর মধ্যে বন বিভাগ পার্কটি আরও সম্প্রসারণে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এর আওতায় পাখির আবাসস্থল, পর্যটকদের বসার শেড, হ্রদ ঘিরে অবকাঠামো, নিরাপত্তাচৌকি, পানি সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেব্‌ল কারের পথ বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল, তবে পরে সেই পরিকল্পনা থেকে বন বিভাগ সরে আসে। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী দুই বছরের বেশি সময় ধরে অচল কেব্‌ল কারটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “অতীতে পার্কের কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে এখন সব কাজ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হবে। পার্কটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রধান আকর্ষণ কেব্‌ল কারটিও সংস্কার করা হবে।”

তারপর পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতেন অন্য প্রান্তে।এখন সেই স্টেশনজুড়ে ভাঙচুরের চিহ্ন।

২০১০ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া ওই কেব্‌ল কারের যাওয়া-আসার পথ প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট বা ৪৮৮ মিটার।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo