ঢাকা ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
টেকনাফে রোহিঙ্গা বহনকারী নৌকাডুবি, নারী ও শিশুর মৃত্যু সিলেটের রায়নগরে ট্রিপল মার্ডার: তদন্তে নামল পিবিআই, বাবুল ২ দিনের রিমান্ডে নতুন পেশায় যুক্ত হলেন অভিনেতা হাসান মাসুদ গোপালগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত ১৭ বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপ, চার বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত ভাটারা নতুন বাজারে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত মানুষকে সমস্যার বদলে সমাধানের কারিগর হিসেবে দেখার আহ্বান শ্যামনগরে মুন্ডা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব উদযাপিত মালয়েশিয়ায় শিশু নির্যাতনবিরোধী অভিযানে বাংলাদেশি সহ ৫৩ জন আটক ইউরোপের কৌশলগত অংশীদার হতে এয়ারবাস কেনা গুরুত্বপূর্ণ: ফরাসি রাষ্ট্রদূত

এআই প্রযুক্তিতে ছবি তৈরিতে কেন এত পানি ও বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে?

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:৪৪:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



স্মার্টফোনে বা কম্পিউটারে কয়েকটি শব্দ লিখে নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চোখের পলকে একটি চমৎকার ছবি তৈরি করে দিচ্ছে। ইদানীং আশির দশকের স্টাইলে ছবি বানানোর একটি নতুন প্রবণতাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগত এই কাজগুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য এতটাই সহজ হয়ে গেছে যে, এর পেছনের জটিল কর্মযজ্ঞ নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। তবে ব্যবহারকারীর একটি মাত্র কমান্ড বা নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পর্দার আড়ালে যে বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি ও বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তা পরিবেশের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। আপাতদৃষ্টিতে নিজের ঘরে বসে এআই ব্যবহারের সময় এক ফোঁটা পানির অপচয়ও চোখে পড়ে না। তবে এআই পরিচালনাকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভার ঠান্ডা রাখতে কেন এত পানির প্রয়োজন হচ্ছে এবং কেন তারা সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, তা গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার।

ধরা যাক, কোনো ব্যবহারকারী চ্যাটজিপিটি কিংবা মিডজার্নির মতো কোনো এআই টুলে পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যাস্তের একটি ছবি বানানোর নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে চলে যায় দূরবর্তী কোনো এক ডেটা সেন্টারে। এই ডেটা সেন্টারগুলো মূলত বিশাল আকৃতির কম্পিউটারের কারখানা, যেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে। ব্যবহারকারীর কাঙ্ক্ষিত ছবিটি মূলত ওই সার্ভারগুলোই তৈরি করে দেয়, যেখানে ব্যক্তিগত ফোন বা ল্যাপটপের নিজস্ব কোনো ভূমিকা থাকে না। সমস্যা হলো, এই হাজার হাজার সার্ভার যখন একসঙ্গে অত্যন্ত জটিল হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে, তখন সেগুলো প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই উত্তাপ যদি সঠিকভাবে অপসারণ করা না যায়, তবে অত্যন্ত মূল্যবান ও সংবেদনশীল যন্ত্রপাতিগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে যাবে। এই উত্তপ্ত সার্ভারগুলোকে সচল ও ঠান্ডা রাখতেই প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানি।

অধিকাংশ বড় ডেটা সেন্টার তাদের সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য মূলত 'বাষ্পীভবন শীতলীকরণ' বা ইভাপোরেটিভ কুলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা মানুষের শরীর ঘামার মতো কাজ করে। গরমের দিনে শরীর ঘামলে এবং সেই ঘাম বাতাসে শুকিয়ে গেলে যেমন ঠান্ডা অনুভূত হয়, ডেটা সেন্টারের প্রযুক্তিটিও ঠিক তেমন। উত্তপ্ত সার্ভারগুলোর পাশ দিয়ে প্রথমে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়। এই পানি সার্ভারের ভেতরের তাপ শুষে নিয়ে নিজে গরম হয়ে যায়। এরপর সেই গরম পানিকে কুলিং টাওয়ারের বাতাস ও বিশেষ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পাঠানো হলে পানির একটি অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। আর এই বাষ্পীভবনের কারণেই বাকি পানিটুকু আবার ঠান্ডা হয়ে যায়, যা পুনরায় সার্ভারে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় পানি মোটেই সাশ্রয় হয় না, বরং প্রচুর সুপেয় পানির অপচয় ঘটে। এর প্রথম কারণ হলো, গরম পানি ঠান্ডা করার সময় পানির একটি বড় অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, যার ঘাটতি মেটাতে প্রতিনিয়ত নতুন সুপেয় পানি সরবরাহ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট পানিতে লোহা, ক্যালসিয়াম ও লবণের মতো খনিজ পদার্থের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। এই খনিজযুক্ত পানি বারবার ব্যবহার করলে সার্ভার ও পাইপের গায়ে আয়রনের আস্তরণ বা স্কেল জমে যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময় পর ওই ঘন পানি ফেলে দিয়ে পুনরায় নতুন সুপেয় পানি যোগ করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকৌশল সাময়িকী আইইইই স্পেকট্রামে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের একটি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, জিপিটি-৩ মডেল দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দের একটি সাধারণ লেখা তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গড় ডেটা সেন্টারে প্রায় ১৭ মিলিলিটার পানি খরচ হতো। এর মধ্যে সরাসরি কুলিং বা ঠান্ডা করার কাজে লাগে পৌনে ২ মিলিলিটার এবং বাকি অংশটি খরচ হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ছবি তৈরির সুনির্দিষ্ট কোনো বৈশ্বিক হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন বিশ্লেষণে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। জ্বালানি খরচের উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে করা কিছু হিসাবে দেখা গেছে, একটি ছবি তৈরিতে গড়ে প্রায় ২৩ মিলিলিটার পানি খরচ হয়। আবার কিছু বিশ্লেষণে এই পানির পরিমাণ ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার বা তার চেয়েও বেশি হতে দেখা গেছে। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো হিসাবের পদ্ধতি—শুধু সার্ভার ঠান্ডা করার পানি নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পানিও এর সঙ্গে যোগ করা হচ্ছে, তার ওপর এই সংখ্যা নির্ভর করে। এর তুলনায় একটি সাধারণ গুগল সার্চে অনেক কম পানি লাগে, যা বিভিন্ন হিসাবে শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৬ মিলিলিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

একক হিসেবে এই সংখ্যাগুলোকে অনেক সামান্য মনে হতে পারে। তবে প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যখন একসঙ্গে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, তখন এই পানির পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউটের (ইইএসআই) তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১১ কোটি গ্যালন পানি খরচ করে, যা প্রায় এক হাজার পরিবারের সারা বছরের পানির চাহিদার সমান। আর বড় ডেটা সেন্টারগুলোয় দৈনিক ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি লাগতে পারে। পানির এই বিপুল ব্যবহার শুধু সার্ভার ঠান্ডা রাখতেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা সেন্টার চালাতে যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তার বড় অংশ এখনো আসে জীবাশ্ম জ্বালানি বা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতেও প্রচুর পানির দরকার হয়। ফলে এআই যত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, পরোক্ষভাবে পানির খরচও তত বাড়বে।

সাধারণত ডেটা সেন্টারগুলো তাদের প্রয়োজনীয় পানি স্থানীয় সরবরাহ লাইন, নদী বা ভূগর্ভস্থ সুপেয় উৎস থেকে সংগ্রহ করে। এর ফলে অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন ব্যবহার ও কৃষিকাজের পানির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা গ্রীষ্মকালে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে মাইক্রোসফট, গুগল ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। মাইক্রোসফট তাদের নিজস্ব টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কুইন্সি এবং সিঙ্গাপুরের মতো এলাকায় পরিশোধিত বর্জ্যপানির ব্যবহার বাড়িয়েছে। বাসাবাড়ি বা কারখানার ব্যবহৃত দূষিত পানিকে শোধনাগারে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করাকে পরিশোধিত বর্জ্যপানি বলা হয়। এই পানি পানের উপযোগী না হলেও ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য বেশ কার্যকর ও নিরাপদ। মাইক্রোসফটের দাবি, সিঙ্গাপুরে তাদের ডেটা সেন্টারের প্রায় ৯৯ শতাংশই এখন অ-সুপেয় পানি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, অ্যামাজনের প্রযুক্তি শাখা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) ২০২৫ সালের জুনে জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১২০টিরও বেশি ডেটা সেন্টারে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার করবে, যার ফলে বছরে প্রায় ৫৩ কোটি গ্যালন সুপেয় পানি সাশ্রয় হবে। গুগল ও মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে 'ওয়াটার পজিটিভ' হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার অর্থ তারা যে পরিমাণ পানি খরচ করবে, তার চেয়ে বেশি পানি বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশে ফিরিয়ে দেবে। অ্যামাজনও একই অঙ্গীকার করেছে এবং তাদের দাবি, ২০২৫ সাল শেষে তারা সেই লক্ষ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করে ফেলেছে।

সুপেয় পানির ওপর থেকে চাপ কমাতে এবং ঠান্ডা রাখার বিপুল খরচ বাঁচাতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সমুদ্রের দিকে ঝুঁকছে। সমুদ্রের পানি প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা এবং এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এই ধারণা থেকে ২০১৮ সালে স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে 'প্রজেক্ট নেটিক' নামে একটি পরীক্ষামূলক ডেটা সেন্টার সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করেছিল মাইক্রোসফট। প্রায় দুই বছর পর সেটি তুলে দেখা যায়, ডাঙায় থাকা সমসংখ্যক সার্ভারের তুলনায় পানির নিচে থাকা সার্ভারগুলো আট গুণ কম নষ্ট হয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের নানা ব্যবহারিক জটিলতার কারণে মাইক্রোসফটের এই প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে আর সামনে এগোয়নি। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড অপারেশনস বিভাগের প্রধান নোয়েল ওয়ালশ সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি জানান, তাঁরা আর বিশ্বের কোথাও পানির নিচে ডেটা সেন্টার তৈরি করছেন না।

মাইক্রোসফট এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ালেও চীন এই প্রযুক্তিতে বেশ এগিয়ে গেছে। চীনা প্রতিষ্ঠান হাইল্যান্ডার হাইনান দ্বীপের উপকূলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটা সেন্টার চালু করেছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে। ১ হাজার ৩০০ টন ওজনের এই স্থাপনাটি সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে। হাইল্যান্ডারের দাবি, পরিকল্পনামতো সেখানে ১০০টি মডিউল বসানো সম্ভব হলে স্থলভাগের একই ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টারের তুলনায় এটি বছরে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ এবং ১ লাখ ৫ হাজার টন সুপেয় পানি সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে।

স্থলভাগের মতো সাগরের নিচে পানি বাষ্প করে সার্ভার ঠান্ডা করা হয় না। সেখানকার সার্ভারগুলো একটি সম্পূর্ণ সিল করা বাক্সের বা মডিউলের ভেতর থাকে। চারপাশের ঠান্ডা লবণাক্ত সমুদ্রের পানি কেবল বাক্সের বাইরের আবরণ দিয়ে ভেতরের তাপ শুষে নেয়। এটি অনেকটা গরম চায়ের কাপ বরফ-ঠান্ডা পানির গামলায় ডুবিয়ে রাখার মতো একটি প্রক্রিয়া। সমুদ্রের পানি সরাসরি যন্ত্রপাতির সংস্পর্শে আসে না বলে এখানে মরিচা ধরারও কোনো ভয় থাকে না। এই পদ্ধতিতে বাষ্পীভবনের কোনো সুযোগ নেই, শুধু তাপের আদান-প্রদান ঘটে। আর বিশাল সমুদ্রের সামান্য একটু পানি এতে যৎসামান্যই গরম হয়, যা সামুদ্রিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ডেটা সেন্টারগুলো কেন একই পানি বারবার রিসাইকেল করে ব্যবহার করে না? এর প্রধান কারণ হলো পানির গুণাগুণ। বাষ্পীভবন পদ্ধতিতে পানি যখন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, তখন পানিতে থাকা সাধারণ খনিজ উপাদানগুলো নিচে পড়ে থাকে এবং অবশিষ্ট পানিতে খনিজের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়। এই পানি বারবার ব্যবহার করলে খনিজ উপাদানগুলো ডেটা সেন্টারের পাইপ বা যন্ত্রপাতির গায়ে পুরু আস্তরণ তৈরি করে। মানুষের রক্তনালিতে চর্বি জমলে যেমন রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয়, পাইপে এই আস্তরণ জমলেও তেমনি পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দামি যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই বাধ্য হয়েই ওই পুরোনো খনিজযুক্ত পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি যোগ করতে হয়।

বিকল্প হিসেবে এখন 'ক্লোজড-লুপ' বা বদ্ধ চক্র এবং 'ইমারশন কুলিং' পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গাড়ির রেডিয়েটরে যেভাবে ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখা হয়, ক্লোজড-লুপ পদ্ধতিটি অনেকটা সে রকম। এতে পানি বা বিশেষ কোনো তরল একটি বদ্ধ পাইপের ভেতর দিয়ে ঘোরে, যা বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে আসে না। ফলে তরলটি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না এবং বারবার ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে ইমারশন কুলিং পদ্ধতিতে পুরো সার্ভারটিকেই বিদ্যুৎ-অপরিবাহী বিশেষ একধরনের রাসায়নিক তরলে ডুবিয়ে রাখা হয়। এই পদ্ধতিগুলোয় পানির অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এলেও নতুন এক সংকট দেখা দেয়। পানি যেহেতু বাষ্প হয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না, তাই ওই বদ্ধ গরম তরলকে ঠান্ডা করতে ডেটা সেন্টারগুলোয় বিশাল আকৃতির বৈদ্যুতিক পাখা বা শক্তিশালী এসি চালাতে হয়। আর এগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর অতিরিক্ত বিদ্যুতের। পাশাপাশি পুরো পদ্ধতিটি স্থাপন করাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রযুক্তি দুনিয়ায় তাই একটি কথা প্রচলিত আছে—বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি খরচ হয়, আর পানি বাঁচাতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি পোড়ে। এই দুটির মধ্যে একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন প্রকৌশলীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

এআই প্রযুক্তিতে ছবি তৈরিতে কেন এত পানি ও বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে?

আপডেট সময় : ০৩:৪৪:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মার্টফোনে বা কম্পিউটারে কয়েকটি শব্দ লিখে নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চোখের পলকে একটি চমৎকার ছবি তৈরি করে দিচ্ছে। ইদানীং আশির দশকের স্টাইলে ছবি বানানোর একটি নতুন প্রবণতাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগত এই কাজগুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য এতটাই সহজ হয়ে গেছে যে, এর পেছনের জটিল কর্মযজ্ঞ নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। তবে ব্যবহারকারীর একটি মাত্র কমান্ড বা নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পর্দার আড়ালে যে বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি ও বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তা পরিবেশের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। আপাতদৃষ্টিতে নিজের ঘরে বসে এআই ব্যবহারের সময় এক ফোঁটা পানির অপচয়ও চোখে পড়ে না। তবে এআই পরিচালনাকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভার ঠান্ডা রাখতে কেন এত পানির প্রয়োজন হচ্ছে এবং কেন তারা সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, তা গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার।

ধরা যাক, কোনো ব্যবহারকারী চ্যাটজিপিটি কিংবা মিডজার্নির মতো কোনো এআই টুলে পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যাস্তের একটি ছবি বানানোর নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে চলে যায় দূরবর্তী কোনো এক ডেটা সেন্টারে। এই ডেটা সেন্টারগুলো মূলত বিশাল আকৃতির কম্পিউটারের কারখানা, যেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে। ব্যবহারকারীর কাঙ্ক্ষিত ছবিটি মূলত ওই সার্ভারগুলোই তৈরি করে দেয়, যেখানে ব্যক্তিগত ফোন বা ল্যাপটপের নিজস্ব কোনো ভূমিকা থাকে না। সমস্যা হলো, এই হাজার হাজার সার্ভার যখন একসঙ্গে অত্যন্ত জটিল হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে, তখন সেগুলো প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই উত্তাপ যদি সঠিকভাবে অপসারণ করা না যায়, তবে অত্যন্ত মূল্যবান ও সংবেদনশীল যন্ত্রপাতিগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে যাবে। এই উত্তপ্ত সার্ভারগুলোকে সচল ও ঠান্ডা রাখতেই প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানি।

অধিকাংশ বড় ডেটা সেন্টার তাদের সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য মূলত 'বাষ্পীভবন শীতলীকরণ' বা ইভাপোরেটিভ কুলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা মানুষের শরীর ঘামার মতো কাজ করে। গরমের দিনে শরীর ঘামলে এবং সেই ঘাম বাতাসে শুকিয়ে গেলে যেমন ঠান্ডা অনুভূত হয়, ডেটা সেন্টারের প্রযুক্তিটিও ঠিক তেমন। উত্তপ্ত সার্ভারগুলোর পাশ দিয়ে প্রথমে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়। এই পানি সার্ভারের ভেতরের তাপ শুষে নিয়ে নিজে গরম হয়ে যায়। এরপর সেই গরম পানিকে কুলিং টাওয়ারের বাতাস ও বিশেষ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পাঠানো হলে পানির একটি অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। আর এই বাষ্পীভবনের কারণেই বাকি পানিটুকু আবার ঠান্ডা হয়ে যায়, যা পুনরায় সার্ভারে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় পানি মোটেই সাশ্রয় হয় না, বরং প্রচুর সুপেয় পানির অপচয় ঘটে। এর প্রথম কারণ হলো, গরম পানি ঠান্ডা করার সময় পানির একটি বড় অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, যার ঘাটতি মেটাতে প্রতিনিয়ত নতুন সুপেয় পানি সরবরাহ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট পানিতে লোহা, ক্যালসিয়াম ও লবণের মতো খনিজ পদার্থের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। এই খনিজযুক্ত পানি বারবার ব্যবহার করলে সার্ভার ও পাইপের গায়ে আয়রনের আস্তরণ বা স্কেল জমে যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময় পর ওই ঘন পানি ফেলে দিয়ে পুনরায় নতুন সুপেয় পানি যোগ করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকৌশল সাময়িকী আইইইই স্পেকট্রামে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের একটি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, জিপিটি-৩ মডেল দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দের একটি সাধারণ লেখা তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গড় ডেটা সেন্টারে প্রায় ১৭ মিলিলিটার পানি খরচ হতো। এর মধ্যে সরাসরি কুলিং বা ঠান্ডা করার কাজে লাগে পৌনে ২ মিলিলিটার এবং বাকি অংশটি খরচ হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ছবি তৈরির সুনির্দিষ্ট কোনো বৈশ্বিক হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন বিশ্লেষণে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। জ্বালানি খরচের উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে করা কিছু হিসাবে দেখা গেছে, একটি ছবি তৈরিতে গড়ে প্রায় ২৩ মিলিলিটার পানি খরচ হয়। আবার কিছু বিশ্লেষণে এই পানির পরিমাণ ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার বা তার চেয়েও বেশি হতে দেখা গেছে। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো হিসাবের পদ্ধতি—শুধু সার্ভার ঠান্ডা করার পানি নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পানিও এর সঙ্গে যোগ করা হচ্ছে, তার ওপর এই সংখ্যা নির্ভর করে। এর তুলনায় একটি সাধারণ গুগল সার্চে অনেক কম পানি লাগে, যা বিভিন্ন হিসাবে শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৬ মিলিলিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

একক হিসেবে এই সংখ্যাগুলোকে অনেক সামান্য মনে হতে পারে। তবে প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যখন একসঙ্গে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, তখন এই পানির পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউটের (ইইএসআই) তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১১ কোটি গ্যালন পানি খরচ করে, যা প্রায় এক হাজার পরিবারের সারা বছরের পানির চাহিদার সমান। আর বড় ডেটা সেন্টারগুলোয় দৈনিক ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি লাগতে পারে। পানির এই বিপুল ব্যবহার শুধু সার্ভার ঠান্ডা রাখতেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা সেন্টার চালাতে যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তার বড় অংশ এখনো আসে জীবাশ্ম জ্বালানি বা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতেও প্রচুর পানির দরকার হয়। ফলে এআই যত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, পরোক্ষভাবে পানির খরচও তত বাড়বে।

সাধারণত ডেটা সেন্টারগুলো তাদের প্রয়োজনীয় পানি স্থানীয় সরবরাহ লাইন, নদী বা ভূগর্ভস্থ সুপেয় উৎস থেকে সংগ্রহ করে। এর ফলে অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন ব্যবহার ও কৃষিকাজের পানির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা গ্রীষ্মকালে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে মাইক্রোসফট, গুগল ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। মাইক্রোসফট তাদের নিজস্ব টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কুইন্সি এবং সিঙ্গাপুরের মতো এলাকায় পরিশোধিত বর্জ্যপানির ব্যবহার বাড়িয়েছে। বাসাবাড়ি বা কারখানার ব্যবহৃত দূষিত পানিকে শোধনাগারে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করাকে পরিশোধিত বর্জ্যপানি বলা হয়। এই পানি পানের উপযোগী না হলেও ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য বেশ কার্যকর ও নিরাপদ। মাইক্রোসফটের দাবি, সিঙ্গাপুরে তাদের ডেটা সেন্টারের প্রায় ৯৯ শতাংশই এখন অ-সুপেয় পানি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, অ্যামাজনের প্রযুক্তি শাখা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) ২০২৫ সালের জুনে জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১২০টিরও বেশি ডেটা সেন্টারে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার করবে, যার ফলে বছরে প্রায় ৫৩ কোটি গ্যালন সুপেয় পানি সাশ্রয় হবে। গুগল ও মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে 'ওয়াটার পজিটিভ' হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার অর্থ তারা যে পরিমাণ পানি খরচ করবে, তার চেয়ে বেশি পানি বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশে ফিরিয়ে দেবে। অ্যামাজনও একই অঙ্গীকার করেছে এবং তাদের দাবি, ২০২৫ সাল শেষে তারা সেই লক্ষ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করে ফেলেছে।

সুপেয় পানির ওপর থেকে চাপ কমাতে এবং ঠান্ডা রাখার বিপুল খরচ বাঁচাতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সমুদ্রের দিকে ঝুঁকছে। সমুদ্রের পানি প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা এবং এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এই ধারণা থেকে ২০১৮ সালে স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে 'প্রজেক্ট নেটিক' নামে একটি পরীক্ষামূলক ডেটা সেন্টার সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করেছিল মাইক্রোসফট। প্রায় দুই বছর পর সেটি তুলে দেখা যায়, ডাঙায় থাকা সমসংখ্যক সার্ভারের তুলনায় পানির নিচে থাকা সার্ভারগুলো আট গুণ কম নষ্ট হয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের নানা ব্যবহারিক জটিলতার কারণে মাইক্রোসফটের এই প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে আর সামনে এগোয়নি। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড অপারেশনস বিভাগের প্রধান নোয়েল ওয়ালশ সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি জানান, তাঁরা আর বিশ্বের কোথাও পানির নিচে ডেটা সেন্টার তৈরি করছেন না।

মাইক্রোসফট এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ালেও চীন এই প্রযুক্তিতে বেশ এগিয়ে গেছে। চীনা প্রতিষ্ঠান হাইল্যান্ডার হাইনান দ্বীপের উপকূলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটা সেন্টার চালু করেছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে। ১ হাজার ৩০০ টন ওজনের এই স্থাপনাটি সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে। হাইল্যান্ডারের দাবি, পরিকল্পনামতো সেখানে ১০০টি মডিউল বসানো সম্ভব হলে স্থলভাগের একই ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টারের তুলনায় এটি বছরে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ এবং ১ লাখ ৫ হাজার টন সুপেয় পানি সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে।

স্থলভাগের মতো সাগরের নিচে পানি বাষ্প করে সার্ভার ঠান্ডা করা হয় না। সেখানকার সার্ভারগুলো একটি সম্পূর্ণ সিল করা বাক্সের বা মডিউলের ভেতর থাকে। চারপাশের ঠান্ডা লবণাক্ত সমুদ্রের পানি কেবল বাক্সের বাইরের আবরণ দিয়ে ভেতরের তাপ শুষে নেয়। এটি অনেকটা গরম চায়ের কাপ বরফ-ঠান্ডা পানির গামলায় ডুবিয়ে রাখার মতো একটি প্রক্রিয়া। সমুদ্রের পানি সরাসরি যন্ত্রপাতির সংস্পর্শে আসে না বলে এখানে মরিচা ধরারও কোনো ভয় থাকে না। এই পদ্ধতিতে বাষ্পীভবনের কোনো সুযোগ নেই, শুধু তাপের আদান-প্রদান ঘটে। আর বিশাল সমুদ্রের সামান্য একটু পানি এতে যৎসামান্যই গরম হয়, যা সামুদ্রিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ডেটা সেন্টারগুলো কেন একই পানি বারবার রিসাইকেল করে ব্যবহার করে না? এর প্রধান কারণ হলো পানির গুণাগুণ। বাষ্পীভবন পদ্ধতিতে পানি যখন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, তখন পানিতে থাকা সাধারণ খনিজ উপাদানগুলো নিচে পড়ে থাকে এবং অবশিষ্ট পানিতে খনিজের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়। এই পানি বারবার ব্যবহার করলে খনিজ উপাদানগুলো ডেটা সেন্টারের পাইপ বা যন্ত্রপাতির গায়ে পুরু আস্তরণ তৈরি করে। মানুষের রক্তনালিতে চর্বি জমলে যেমন রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয়, পাইপে এই আস্তরণ জমলেও তেমনি পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দামি যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই বাধ্য হয়েই ওই পুরোনো খনিজযুক্ত পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি যোগ করতে হয়।

বিকল্প হিসেবে এখন 'ক্লোজড-লুপ' বা বদ্ধ চক্র এবং 'ইমারশন কুলিং' পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গাড়ির রেডিয়েটরে যেভাবে ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখা হয়, ক্লোজড-লুপ পদ্ধতিটি অনেকটা সে রকম। এতে পানি বা বিশেষ কোনো তরল একটি বদ্ধ পাইপের ভেতর দিয়ে ঘোরে, যা বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে আসে না। ফলে তরলটি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না এবং বারবার ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে ইমারশন কুলিং পদ্ধতিতে পুরো সার্ভারটিকেই বিদ্যুৎ-অপরিবাহী বিশেষ একধরনের রাসায়নিক তরলে ডুবিয়ে রাখা হয়। এই পদ্ধতিগুলোয় পানির অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এলেও নতুন এক সংকট দেখা দেয়। পানি যেহেতু বাষ্প হয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না, তাই ওই বদ্ধ গরম তরলকে ঠান্ডা করতে ডেটা সেন্টারগুলোয় বিশাল আকৃতির বৈদ্যুতিক পাখা বা শক্তিশালী এসি চালাতে হয়। আর এগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর অতিরিক্ত বিদ্যুতের। পাশাপাশি পুরো পদ্ধতিটি স্থাপন করাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রযুক্তি দুনিয়ায় তাই একটি কথা প্রচলিত আছে—বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি খরচ হয়, আর পানি বাঁচাতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি পোড়ে। এই দুটির মধ্যে একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন প্রকৌশলীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo