সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ঠেকাতে আসছে অভিন্ন দরতালিকা
- আপডেট সময় : ১২:৫৫:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ও অস্বাভাবিক দরের ফারাক ঠেকাতে সব সরকারি প্রকৌশল সংস্থার জন্য একটি অভিন্ন ও একক দরতালিকা (রেট শিডিউল) প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এ-সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি। এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে একই ধরনের নির্মাণকাজে বিভিন্ন দপ্তরের আলাদা দর নির্ধারণের সুযোগ কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। যেসব সরকারি সংস্থার নিজস্ব কোনো দরতালিকা নেই, তাদেরও এই নতুন তালিকা মেনে কেনাকাটা করতে হবে।
অতীতে সরকারি কেনাকাটায় অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। যেমন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য একেকটি বালিশ ৬ হাজার ৯৫৭ টাকা থেকে শুরু করে ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত দামে কেনা হয়েছিল। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বালিশের প্রস্তাবিত দর ছিল ২৭ হাজার ৭২০ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য একেকটি গগলসের দাম ৫ হাজার টাকা, হ্যান্ড গ্লাভস ৩৫ হাজার টাকা এবং রক্ত পরীক্ষার ক্ষুদ্র একটি টিউবের দাম ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ধরার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে।
গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই কমিটি গঠন করা হয়। সরকারি নির্মাণকাজের দর তফসিল মূল্যায়ন ও পুনর্নির্ধারণে গঠিত এই কমিটির আহ্বায়ক হলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, সব সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, একক দরতালিকা মানেই সারা দেশে সব কাজ একই দরে করতে হবে এমন নয়। দেশের দুর্গম, পাহাড়ি, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং যাতায়াত ব্যয় বিবেচনা করে অঞ্চলভিত্তিক (জোনাল) দর নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। মূল দরকাঠামো এক থাকলেও বিশেষ এলাকার অতিরিক্ত খরচ আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া যেসব সংস্থার নিজস্ব বিশেষায়িত কাজ রয়েছে, তাদের জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকা থাকবে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারদর, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ভ্যাট ও করের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই দরতালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিত নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর সংগ্রহ করে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে। প্রতিটি সংস্থা বিবিএসের ওয়েবসাইট থেকে একক মূল্য নিয়ে তাদের প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরি করবে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়েছে নির্মাণ ব্যয়ের ওপর। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে প্রতি ডলারের গড় মূল্য ৮৪ টাকা থাকলেও ২০২৬ সালের চলতি সময়ে তা দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকায়, যার ফলে টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে নির্মাণশ্রমিকদের মজুরিও।
বিটুমিনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি মূল্য, শুল্ক ও যাতায়াত খরচ বিবেচনা করে দর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা প্রবেশ করে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হওয়া দরের তথ্য হালনাগাদ করতে পারবেন।
বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব দরতালিকা থাকলেও সেগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও সেতু বিভাগের মতো অনেক সংস্থার নিজস্ব কোনো দরতালিকাই নেই। কমিটির সদস্যসচিব এবং পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ জানান, ইট, রড, سیمেন্ট ও বালুর মতো সাধারণ উপকরণের জন্য একটি একক তালিকা থাকবে। একক রেট শিডিউলের কাজ প্রায় শেষ এবং শিগগিরই তা একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে।
তবে কেবল একক দর নির্ধারণ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, সমস্যার শিকড়ে পৌঁছাতে হবে। অনিয়ম রোধে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও ক্রয় বিধি (পিপিআর) পুরোপুরি মেনে চলতে হবে এবং বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) মাধ্যমে পুরো কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনতে হবে।



























