নতুন পর্ষদেও কাটেনি সংকট, অনিয়ম ও লোকসানে ধুঁকছে আইএফআইসি ব্যাংক
- আপডেট সময় : ০৯:৪৪:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হলেও কাটেনি এর গভীর সংকট। উল্টো ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং লোকসানের বোঝা আরও ভারী হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বর্তমান চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শনে প্রমাণিত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএফআইসি ব্যাংকটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের। এ সময় তিনি বেনামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নেন। শুধু নিজেই নন, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকেও হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ করে দেন তিনি। তৎকালীন সময়ে এসব খেলাপি ঋণকে নিয়মিত দেখিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত নাজুক পরিস্থিতি গোপন রাখা হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর সালমান এফ রহমান ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারান। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান করে ছয় সদস্যের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে ব্যাংকের গোপন খেলাপি ঋণ বের করা শুরু হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে লাফিয়ে ওঠে।
হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩,৭৫৬ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বিতরণকৃত ঋণের ৮.৭২ শতাংশ। কিন্তু চলতি ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা দাঁড়ায় ২৮,১৭৪ কোটি টাকায় (৬৩.৪৬ শতাংশ)। খেলাপি ঋণ উদ্ঘাটনের পর তা সর্বোচ্চ ২৭,২৫০ কোটি টাকা বা ৬১.৪৭ শতাংশে পৌঁছানোর পর কমার কথা থাকলেও তা আরও বেড়ে গত জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ২৮,২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশে। এই খেলাপি ঋণের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা আওয়ামী লীগ আমলে সালমান এফ রহমানের বেনামি ও অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে কোনো জামানত ছাড়াই বিতরণ করা হয়েছিল।
খেলাপি ঋণ এভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। ২০২৪ সালের জুনে যেখানে প্রভিশন ঘাটতি ছিল মাত্র ৫০৫ কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ২১,৮৯৩ কোটি টাকায়। এই ঘাটতির কারণে ব্যাংকটি বড় ধরনের মূলধন সংকটে পড়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭,৫৫৪ কোটি টাকা, অথচ ২০২৪ সালের জুনেও ব্যাংকটির ২৬৭ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ঘাটতি পূরণের কর্মপরিকল্পনা চাইলে আইএফআইসি ব্যাংক জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তাদের ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হবে।
আর্থিক সূচকের এই ক্রমাগত অবনতি, সুদ থেকে আয় না হওয়া এবং প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকটি এখন বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধেই আইএফআইসি ব্যাংক ১,৬৬৮ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান দিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল ২,৫৬২ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেও ব্যাংকটি ৬৩ কোটি টাকা মুনাফায় ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ উন্মোচনের পর ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল আর্থিক সূচকের উন্নতি করা। কিন্তু বর্তমান পর্ষদ ও চেয়ারম্যানের ব্যর্থতায় পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। শিগগিরই ভেঙে দেওয়া ব্যাংকগুলোর পর্ষদ মূল্যায়ন করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে জানতে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যাংকের মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে মুখপাত্র হেলাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




























