ঢাকা ০১:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাতক্ষীরায় ফেসবুক লাইভ করে যুবককে পিটিয়ে হত্যা গাজীপুরে রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে মাদক কারবারিদের হামলা, আহত ২ নোবিপ্রবির পুরো ক্যাম্পাস সৌরবিদ্যুৎ চালুর পরিকল্পনা প্রতি তিন মাস পর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির তথ্য নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মোহাম্মদপুরে দুই গ্রুপের গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ একজন কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ ও বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে প্রবাসী বাঙালির জমজমাট দুর্গোৎসব ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হাইতিতে জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫০ সদস্যের অগ্রবর্তী দল বাংলাদেশের কৃষিকে লাভজনক খাতে রূপান্তরের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

দলবাজ ও দলদাসের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৪:২৭:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দের সংযোজন ঘটে এবং অনেক সময় ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুরোনো শব্দও নতুন অর্থে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়। যেমন আঠারো শতকে সুবে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার আত্মীয় ও সেনাপতি মীর জাফর আলী খান যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নবাবকে গদিচ্যুত ও হত্যা করান, তখন থেকেই 'মীরজাফর' শব্দটি বিশ্বাসঘাতকের সমার্থক হয়ে ওঠে। একইভাবে সপ্তম শতাব্দীতে ইরাকের কারবালায় সংঘটিত বেদনাদায়ক যুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করে আজও যেকোনো বড় বিয়োগান্ত ঘটনাকে 'কারবালা হয়ে গেছে' বলে অভিহিত করা হয়।

রাজনীতির মাঠেও এমন অনেক শব্দ চালু রয়েছে, যার মধ্যে 'দলবাজ' ও 'দলদাস' অন্যতম। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, দল করা খারাপ কিছু নয়, তবে 'দলবাজি' শব্দটির অর্থ নেতিবাচক। দলবাজরা মূলত দলের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে। এদের কোনো আদর্শ বা নির্দিষ্ট পেশা থাকে না এবং এরা পানির মতো রূপ পরিবর্তন করে সুযোগ বুঝে দল বদলায়। নেতার ডানে-বাঁয়ে সার্বক্ষণিক ঘুরে বেড়ানো এই শ্রেণির মানুষেরা মূলত চাঁদাবাজি, ছিনতাই বা দখলদারির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। এই দলবাজি যখন জেঁকে বসে, তখন দল আর রাজনৈতিক দল থাকে না, বরং একটি সিন্ডিকেটে পরিণত হয়। কয়েক মাস আগে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজিকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে একজন মন্ত্রী একে 'স্বেচ্ছামূলক' ও ভালো বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, যা মূলত লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থারই অংশ। এই লুটপাটের ভাগের অর্থ নীতিনির্ধারকদের কাছেও যায় বলে অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে এই সেক্টরে কোনো পরিবর্তন আসে না।

অন্যদিকে, 'দাস' প্রথা এখন প্রকাশ্যে না থাকলেও পরোক্ষভাবে তা এখনো সচল রয়েছে। দেশ থেকে কাজের সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতিকে আধুনিক দাসপ্রথারই একটি রূপ বলা চলে, যদিও তাঁদের আমরা গালভরা নামে 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা' বলে থাকি। রাজনীতির মাঠেও এই দাসের অস্তিত্ব রয়েছে, যাদের 'দলদাস' বলা হয়। গত ১০-১৫ বছর ধরে এই শব্দটির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দলবাজ ও দলদাসের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য হলো—দলবাজরা সুযোগসন্ধানী, কিন্তু দলদাসরা হলো দলের অন্ধ ভক্ত। তারা নিজেদের যুক্তি-বুদ্ধি ও স্বাধীন মতামতকে বাক্সবন্দী রেখে দল বা কোনো নেতাকে ঈশ্বরতুল্য মনে করে এবং অন্ধভাবে দলের স্বার্থকে অনুসরণ করে।

দলদাসদের মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগটি পদ-পদবি, পুরস্কার ও নানা জাগতিক সুযোগ-সুবিধার আশায় অন্ধ আনুগত্য দেখায়। দল ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও তারা প্রাপ্তির আশায় দল ছাড়ে না। বাংলাদেশে একদলীয় শাসন বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর অনেক নেতা-কর্মী স্বাধীন মত প্রকাশ না করে নীরব থেকে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন। এখনও অনেকে মনে করেন যে শেখ মুজিবুর রহমানের চালু করা বাকশাল একটি ভালো পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয় শ্রেণির দলদাসরা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা ছাড়াই দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ থাকে। তারা মনে করে তারা আদর্শের জন্য রাজনীতি করছে এবং তাদের নেতা সম্পূর্ণ অভ্রান্ত ও বাকি সবাই বিভ্রান্ত। অন্ধবিশ্বাস ও শর্তহীন আনুগত্যের কারণে কোনো যুক্তি দিয়েই তাদের বোঝানো সম্ভব হয় না।

রাজনীতিতে এই অন্ধ অনুকরণ বা দলদাস মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় হুমকি। যখন ব্যক্তি নিজের বিবেক ও স্বাধীন চিন্তাকে বিসর্জন দিয়ে দলের নির্দেশকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে, তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে একরৈখিক ও দমনমূলক। হিটলারের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে জার্মানির মানুষ ও সেনারা তাঁর নীতিকে সমর্থন করে ভয়াবহ যুদ্ধ ও গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। বাংলা সাহিত্যেও দলদাস শব্দটি প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক বা সমালোচনামূলক অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা মানুষের স্বাধীন চিন্তা হারিয়ে ফেলার বিষয়টিকে তুলে ধরে।

মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আমাদের দেশে দলদাস তৈরির একটি বড় কারখানা হলো দেশের সংবিধান। সংবিধানের ৭০ নম্বর ধারাটি দলদাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার একটি বড় অস্ত্র। আপাতদৃষ্টিতে এই ধারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখলেও এটি সংসদকে কার্যত পুতুল সংসদে পরিণত করেছে। অবশ্য পাকিস্তান আমলে ঘন ঘন দলত্যাগ বা সংসদ সদস্যদের কেনাবেচার মাধ্যমে সরকার পতনের ইতিহাস বিবেচনা করলে এই ধারার পক্ষেও প্রবল যুক্তি রয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

দলবাজ ও দলদাসের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ০৪:২৭:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দের সংযোজন ঘটে এবং অনেক সময় ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুরোনো শব্দও নতুন অর্থে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়। যেমন আঠারো শতকে সুবে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার আত্মীয় ও সেনাপতি মীর জাফর আলী খান যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নবাবকে গদিচ্যুত ও হত্যা করান, তখন থেকেই 'মীরজাফর' শব্দটি বিশ্বাসঘাতকের সমার্থক হয়ে ওঠে। একইভাবে সপ্তম শতাব্দীতে ইরাকের কারবালায় সংঘটিত বেদনাদায়ক যুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করে আজও যেকোনো বড় বিয়োগান্ত ঘটনাকে 'কারবালা হয়ে গেছে' বলে অভিহিত করা হয়।

রাজনীতির মাঠেও এমন অনেক শব্দ চালু রয়েছে, যার মধ্যে 'দলবাজ' ও 'দলদাস' অন্যতম। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, দল করা খারাপ কিছু নয়, তবে 'দলবাজি' শব্দটির অর্থ নেতিবাচক। দলবাজরা মূলত দলের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে। এদের কোনো আদর্শ বা নির্দিষ্ট পেশা থাকে না এবং এরা পানির মতো রূপ পরিবর্তন করে সুযোগ বুঝে দল বদলায়। নেতার ডানে-বাঁয়ে সার্বক্ষণিক ঘুরে বেড়ানো এই শ্রেণির মানুষেরা মূলত চাঁদাবাজি, ছিনতাই বা দখলদারির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। এই দলবাজি যখন জেঁকে বসে, তখন দল আর রাজনৈতিক দল থাকে না, বরং একটি সিন্ডিকেটে পরিণত হয়। কয়েক মাস আগে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজিকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে একজন মন্ত্রী একে 'স্বেচ্ছামূলক' ও ভালো বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, যা মূলত লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থারই অংশ। এই লুটপাটের ভাগের অর্থ নীতিনির্ধারকদের কাছেও যায় বলে অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে এই সেক্টরে কোনো পরিবর্তন আসে না।

অন্যদিকে, 'দাস' প্রথা এখন প্রকাশ্যে না থাকলেও পরোক্ষভাবে তা এখনো সচল রয়েছে। দেশ থেকে কাজের সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতিকে আধুনিক দাসপ্রথারই একটি রূপ বলা চলে, যদিও তাঁদের আমরা গালভরা নামে 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা' বলে থাকি। রাজনীতির মাঠেও এই দাসের অস্তিত্ব রয়েছে, যাদের 'দলদাস' বলা হয়। গত ১০-১৫ বছর ধরে এই শব্দটির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দলবাজ ও দলদাসের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য হলো—দলবাজরা সুযোগসন্ধানী, কিন্তু দলদাসরা হলো দলের অন্ধ ভক্ত। তারা নিজেদের যুক্তি-বুদ্ধি ও স্বাধীন মতামতকে বাক্সবন্দী রেখে দল বা কোনো নেতাকে ঈশ্বরতুল্য মনে করে এবং অন্ধভাবে দলের স্বার্থকে অনুসরণ করে।

দলদাসদের মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগটি পদ-পদবি, পুরস্কার ও নানা জাগতিক সুযোগ-সুবিধার আশায় অন্ধ আনুগত্য দেখায়। দল ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও তারা প্রাপ্তির আশায় দল ছাড়ে না। বাংলাদেশে একদলীয় শাসন বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর অনেক নেতা-কর্মী স্বাধীন মত প্রকাশ না করে নীরব থেকে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন। এখনও অনেকে মনে করেন যে শেখ মুজিবুর রহমানের চালু করা বাকশাল একটি ভালো পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয় শ্রেণির দলদাসরা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা ছাড়াই দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ থাকে। তারা মনে করে তারা আদর্শের জন্য রাজনীতি করছে এবং তাদের নেতা সম্পূর্ণ অভ্রান্ত ও বাকি সবাই বিভ্রান্ত। অন্ধবিশ্বাস ও শর্তহীন আনুগত্যের কারণে কোনো যুক্তি দিয়েই তাদের বোঝানো সম্ভব হয় না।

রাজনীতিতে এই অন্ধ অনুকরণ বা দলদাস মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় হুমকি। যখন ব্যক্তি নিজের বিবেক ও স্বাধীন চিন্তাকে বিসর্জন দিয়ে দলের নির্দেশকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে, তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে একরৈখিক ও দমনমূলক। হিটলারের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে জার্মানির মানুষ ও সেনারা তাঁর নীতিকে সমর্থন করে ভয়াবহ যুদ্ধ ও গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। বাংলা সাহিত্যেও দলদাস শব্দটি প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক বা সমালোচনামূলক অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা মানুষের স্বাধীন চিন্তা হারিয়ে ফেলার বিষয়টিকে তুলে ধরে।

মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আমাদের দেশে দলদাস তৈরির একটি বড় কারখানা হলো দেশের সংবিধান। সংবিধানের ৭০ নম্বর ধারাটি দলদাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার একটি বড় অস্ত্র। আপাতদৃষ্টিতে এই ধারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখলেও এটি সংসদকে কার্যত পুতুল সংসদে পরিণত করেছে। অবশ্য পাকিস্তান আমলে ঘন ঘন দলত্যাগ বা সংসদ সদস্যদের কেনাবেচার মাধ্যমে সরকার পতনের ইতিহাস বিবেচনা করলে এই ধারার পক্ষেও প্রবল যুক্তি রয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo