সীতাকুণ্ডে মাওলানা ওবায়দুল হকের জ্বালানো শিক্ষার প্রদীপ জ্বলছে ১৪০ বছর ধরে
- আপডেট সময় : ০৩:২৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

তৎকালীন সময়ে শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষাকে বেছে নিয়েছিলেন মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.)। সীতাকুণ্ডে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে প্রায় ১৪০ বছর আগে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার সুফল আজও ভোগ করছে এ অঞ্চলের মানুষ। তাঁর হাতে গড়া সীতাকুণ্ড কামিল (এম.এ.) মাদ্রাসা ও সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় যুগের পর যুগ ধরে নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে চলেছে।
১৮৫৬ সালে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন আলেম, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.)। ব্রিটিশ শাসনামলের সেই অনগ্রসর সময়ে অজ্ঞতা ও পশ্চাৎপদতা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে তিনি শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ ও আধুনিক শিক্ষার গুরুত্বও তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন।
এই লক্ষ্য থেকেই ১৮৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সীতাকুণ্ড কামিল (এম.এ.) মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় তিনি নিজেই এই প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মেধা, শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সময়ের পরিক্রমায় মাদ্রাসাটি কামিল পর্যায়ে উন্নীত হয় এবং এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে অসংখ্য আলেম, শিক্ষক, ইমাম, খতিব ও সমাজসেবক দেশে-বিদেশে অবদান রাখছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৪ সালে সীতাকুণ্ড কামিল (এম.এ.) মাদ্রাসা জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মান অর্জন করে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত থেকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ক্রেস্ট ও সনদ গ্রহণ করেছিলেন।
মাদ্রাসাটির বর্তমান অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.) কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি, তিনি এই অঞ্চলে শিক্ষা-জাগরণের একটি মজবুত ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন। তাঁর সেই শিক্ষা-দর্শনকে ধারণ করেই শিক্ষার্থীদের সৎ, দক্ষ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার প্রসারেও মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ.) ছিলেন সমান দূরদর্শী। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১৩ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সীতাকুণ্ড হাই স্কুল’, যা বর্তমানে ‘সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এলাকার সাধারণ পরিবারের সন্তানদের মাধ্যমিক শিক্ষার পথ সুগম হয়।
এই বিদ্যালয়ের শতবর্ষী ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও গবেষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। জানা যায়, ১৯১৪ সালে তিনি এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় যোগ করেছে।
শিক্ষা বিস্তারের বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ওবায়দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থানীয় মসজিদ ও ঈদগাহসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা আজও তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ড কামিল মাদ্রাসা এবং সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এখন কেবল দুটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান নয়, এগুলো এই অঞ্চলের সামাজিক পরিবর্তনের জীবন্ত ইতিহাস। শত বছরের বেশি সময় ধরে এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে বহু শিক্ষার্থী প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, আইন, গবেষণা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ব্যবসায়িক খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
তারা মনে করেন, মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.)-এর জীবন, কর্ম ও শিক্ষা-দর্শন নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর পুরোনো নথিপত্র, দলিল ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা জরুরি। এ জন্য একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ ও গবেষণাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সীতাকুণ্ডের শিক্ষা-জাগরণের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।





























