শুল্কসুবিধা পেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০৪:২৪:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে চীনের বাজার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় নতুন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো চীনের হারানো বাজার দখলে এগিয়ে গেলেও শুল্কসুবিধা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব এবং সময়ের সাথে সাথে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে না পারাই এর প্রধান কারণ।
বাংলাদেশ এখনো মূলত কটন বা সুতিভিত্তিক পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেইড ফাইবার (এমএমএফ) পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত পোশাকের ৫৭ শতাংশই ছিল এমএমএফভিত্তিক পণ্য। কিন্তু এই চাহিদার সাথে তাল মেলাতে পারছেন না দেশীয় উদ্যোক্তারা। ইউএস অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮.১ শতাংশ কমে সোয়া তিন বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনাম ৬.৩৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের চেয়ে দেড় শতাংশ বেশি।
চীনের ছেড়ে দেওয়া বাজার ধরার ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়াও বেশ এগিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি ৫.৪৯ শতাংশ বেড়ে ১.৯৭ বিলিয়ন ডলার এবং কম্বোডিয়ার রপ্তানি ১৪.৯ শতাংশ বেড়ে ১.৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এমএমএফ বা নন-কটন পোশাকের বিশ্ববাজারে ভিয়েতনামের অংশ যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের হিস্যা মাত্র ৬ শতাংশ। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), উন্নত পণ্য এবং কম লিড টাইমের কারণে ভিয়েতনাম এই বাজারে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
পোশাক খাতের এই স্থবিরতা নিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাবেই। কৃত্রিম তন্তু বা এমএমএফভিত্তিক টেক্সটাইল শিল্পে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করার তাগিদ দেন তিনি। যেহেতু কৃত্রিম তন্তুর উৎপাদন খরচ বেশি, তাই দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ও অংশীদারত্বমূলক কাজ এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া এই খাতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা এবং বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এসএম আবু তৈয়ব জানান, চীনের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভিয়েতনাম মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে, যা তাদের লিড টাইম কমিয়ে দেয়। বিপরীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সময় লাগে ১৮ থেকে ৩০ দিন। বন্দর ও কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতা এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাবই এই দীর্ঘ লিড টাইমের জন্য দায়ী। পাশাপাশি ভিয়েতনামের পোশাক খাতে চীনসহ অন্যান্য দেশের প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ তাদের প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নিয়েছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, ইউরোপীয় Unions (ইইউ) বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ইইউভুক্ত দেশগুলো বিশ্ববাজার থেকে ২,৭৭৭ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১০.৪২ শতাংশ কম। তবে ইইউর সামগ্রিক আমদানির তুলনায় বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা কমেছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। এই চার মাসে বাংলাদেশ ইইউতে ৬০৯ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের (৭৫৪ কোটি ইউরো) তুলনায় ১৯.৩৩ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম মূলত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA), উন্নত ও বহুমুখী পণ্যের সমাহার, কম লিড টাইম বা দ্রুত সরবরাহ এবং সিনথেটিক ফাইবারের ব্যবহারের দিক থেকে এগিয়ে আছে। এমএমএফ বা নন-কটন পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের দখল যেখানে মাত্র ৬ শতাংশ, সেখানে ভিয়েতনামের দখল প্রায় ১০ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী পোশাকের চাহিদা সুতি বা কটন থেকে সিনথেটিক ফাইবারের দিকে স্থানান্তরিত হলেও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও পলিসি সহায়তার অভাবে বাংলাদেশ এই উচ্চমূল্যের বাজারে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।




























