দাকোপ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি সেবায় ‘টাকার খেলা’, কাঠগড়ায় কর্মকর্তা
- আপডেট সময় : ০২:৩৮:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা খুলনার দাকোপ উপজেলার সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে এসে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীর যেখানে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সেবা পাওয়ার কথা, সেখানে প্রতিটি পদে তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। আর এই পুরো অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদীপ কুমার বালা। তার বিরুদ্ধে হাসপাতালটিকে নিজের ‘ব্যক্তিগত ক্লিনিক’ বানিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই অনিয়মের প্রতিবাদে ভুক্তভোগী জনগণ একাধিকবার বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন ডা. সুদীপ কুমার বালা। এর আগে তিনি কয়রায় কর্মরত ছিলেন। বাগেরহাট জেলার দিগরাজের বাসিন্দা ডা. সুদীপ এলাকায় নিজেকে সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য শেখ তন্ময়ের বন্ধু পরিচয় দিয়ে দাপট দেখাতেন। নিজের প্রভাবকে দীর্ঘস্থায়ী করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অসিত সাহার সঙ্গেও বিশেষ সখ্য গড়ে তোলেন তিনি। এই রাজনৈতিক প্রভাবের জোরেই তিনি প্রথম থেকে হাসপাতালটিতে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
হাসপাতালে এক্সরে ছাড়া সব ধরনের প্যাথলজিক্যাল টেস্টের সুবিধা এবং আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকা সত্ত্বেও রোগীদের জোর করে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়। হাসপাতালে যেখানে আপার অ্যাবডোমিন টেস্টের সরকারি ফি ২০০ টাকা এবং হোল অ্যাবডোমিন টেস্টের ফি ২৫০ টাকা, সেখানে রোগীদের বাইরে গিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ করে এই পরীক্ষাগুলো করাতে হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের বার্ষিক ওষুধ কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশনের নামে। প্রতিটি সিজারের জন্য রোগীদের কাছ থেকে সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক বা প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নেই—এমন নানা অজুহাতে এই টাকা নেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাইরে থেকে কোনো সার্জন না এনে ডা. সুদীপ নিজেই এই অপারেশনগুলো করেন এবং সিংহভাগ টাকা নিজের পকেটে ভরেন। সামান্য কিছু টাকা অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক ও সহকারীদের দেওয়া হয়। এছাড়া রোগীদের কেবিন বরাদ্দের জন্যও অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়।
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়েও চলছে চরম স্বেচ্ছাচারিতা। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত যাতায়াতের সরকারি নির্ধারিত ভাড়া ৮০০ টাকা হলেও ডা. সুদীপ আসার পর তা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা করা হয়। এমনকি নিজের পূর্বের কর্মস্থল কয়রা থেকে মো. আসাদ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে এনে মাস্টার রোলে মালী পদে নিয়োগ দেন তিনি। কিন্তু তাকে দিয়ে মূলত অ্যাম্বুলেন্স চালানো হতো। সম্প্রতি স্থানীয় এমপির সুপারিশে একজন চালক নিয়োগ পাওয়ার পর আসাদ এখন ডা. সুদীপের ব্যক্তিগত গাড়ি চালাচ্ছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. সুদীপ কুমার বালা দাবি করেন, হাসপাতালে গাইনি ও অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে সিজার করাতে হয়। এ জন্য সাড়ে ৪ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তা তিনি নিজে নেন না, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দেওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্সের অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি চালক না থাকায় আউটসোর্সিংয়ের চালককে অতিরিক্ত ৪০০ টাকা দেওয়া হয়। আগের এমপির আমলে এ সংক্রান্ত একটি রেজুলেশন করা হয়েছিল এবং বর্তমান সিভিল সার্জনকেও তা জানানো হয়েছে। তবে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠানো বা অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
এই অনিয়মের বিষয়ে খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, আগের এমপির আমলের কোনো রেজুলেশনের তথ্য বা কাগজপত্র তার দপ্তরে নেই এবং এ বিষয়ে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। সিভিল সার্জন আরও বলেন, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে মুঠোফোনে দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. সুদীপ বালার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনি ও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে সিজারিয়ান অপারেশন করাতে হয়। এক্ষেত্রে অপারেশন প্রতি তাদের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। তবে এ টাকা তিনি নিজে নেন না বলে দাবি করেন। যারা সিজারিয়ান অপারেশন করেন, তাদেরই এই টাকা দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।


























