সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের ‘মক্কা চুক্তি’ কি ইসরায়েলের জন্য নতুন হুমকি?
- আপডেট সময় : ০৯:৫২:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তিটি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের পরিবর্তে পবিত্র মক্কা শহরে সই হয়েছে এবং এর সঙ্গে তিন দেশের নেতাদের প্রার্থনার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। যদিও সৌদি আরব দ্রুতই স্পষ্ট করেছে যে এই চুক্তি কোনো সম্প্রদায়ভিত্তিক বা সামরিক জোট গঠনের উদ্দেশ্যে নয়, তবুও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন থামছে না। বিশেষ করে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় রিয়াদের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অক্ষ গঠনের ঘোষণার পর এই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে। এর আগে এক দশক আগে গঠিত ‘ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশন’ (আইএমসিটিসি) বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ বহু দেশকে একটি জোটে নিয়ে এসেছিল, যার প্রথম কমান্ডার ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ।
এমন এক সময়ে এই মক্কা চুক্তিটি সামনে এল, যখন কয়েকটি চলমান সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি, লেবানন, সিরিয়া ও দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের আগ্রাসী সামরিক তৎপরতা এবং ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির নিজস্ব যুদ্ধ। তুর্কি ও পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমগুলো এই চুক্তি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছে এবং একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য ব্যবস্থার সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে এবং কার বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করবে, তা এখনো অস্পষ্ট। ২০১৭ সালেও আইএমসিটিসি গঠনের সময় ইরান ও তার মিত্রদের মোকাবিলা করার বিষয়টি সামনে এসেছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই মক্কা চুক্তি কি আসলে ইরান ও তার মিত্রদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, নাকি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নতুন কোনো হামলা ঠেকানোর কৌশল?
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব—সব কটি দেশই অতীতে বিভিন্ন ছায়া যুদ্ধে জড়িত ছিল, যার প্রভাব সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে দেখা গেছে। আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে এই তিন দেশের বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। তবে এই চুক্তির পর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বাড়তি উদ্বেগ বেশ চোখে পড়ার মতো। তেল আবিবের শীর্ষ কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে ইরানের স্থান নিতে একটি নতুন ‘সুন্নি’ অক্ষ গড়ে উঠছে, যা ইসরায়েলের প্রধান শত্রু হয়ে উঠতে পারে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট থেকে শুরু করে সরকারের সাবেক মুখপাত্র ইলন লেভি—অনেকের মতেই, সৌদি ও কাতারের অর্থায়নে পাকিস্তান ও তুরস্কের অংশীদারত্ব ইসরায়েলের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনতে পারে।
সম্প্রতি তেহরানে পাকিস্তানি দূতাবাসের কাছে ইসরায়েলি হামলার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইসরায়েলকে সরাসরি সতর্ক করেছে। অন্যদিকে ‘জেরুজালেম পোস্ট’ এক নিবন্ধে জানিয়েছে, সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ইরানের বিষয়ে তাঁর প্রধান আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁকে ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলেও ডেকেছেন। ট্রাম্প গাজা শান্তি আলোচনাতেও পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন, যা ইসরায়েলকে অসন্তুষ্ট করেছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলাকে ‘শয়তানি’ বলে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য এবং তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপের পুরোনো হুমকি তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে গ্রিসকে এই নতুন জোটের প্রথম সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করছে, যা ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র। বিরোধপূর্ণ সাগরে পাকিস্তানি সামরিক শক্তির উপস্থিতি নিয়ে গ্রিস উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং একে তারা তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ সামরিক প্রস্তুতির লক্ষণ হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের আরেক মিত্র ভারতও বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কি-পাকিস্তানি সামরিক জোটকে রুখতে তারা গ্রিসের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। তুর্কি পাইলটদের পাকিস্তানি পাইলটদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ে গ্রিস প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় পাকিস্তানকে সমর্থন করায় গত বছর তুরস্কের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল ভারত।
তবে প্রতীকী সমর্থনের বাইরে তুরস্ক বাস্তবে পাকিস্তানকে কতটা সামরিক সহায়তা দিতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। ন্যাটো সদস্য হিসেবে তুরস্কের কোনো যুদ্ধ পুরো সামরিক জোটের ওপর প্রভাব ফেলবে। তা ছাড়া পাকিস্তান ও সৌদি আরব—উভয় দেশই মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্রেতা, যেখানে ওয়াশিংটনের ভেটো দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। যেমন ২০২২ সালে পাকিস্তানের কাছে তুরস্কের ৩০টি অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের চিরন্তন দ্বন্দ্বে সৌদি আরব কখনো প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে যায়নি, বরং তারা নিজেদের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী মনে করে এবং ভারত সৌদির অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। একইভাবে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যকার বিরোধেও সৌদির পক্ষ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। গত মাসেই রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানা যায়, সৌদির ইয়ানবু তেল শোধনাগারের দিকে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছেন সৌদিতে কর্মরত গ্রিক সামরিক সদস্যরা।
ফলে ইসরায়েলের কথিত ভয় কিংবা সৌদির ওপর ‘ইরানি হুমকি’র বাইরে এই জোটের বাস্তব গুরুত্ব কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এটি কি কেবলই একধরনের প্রতীকী পদক্ষেপ—শত্রুদের এই বার্তা দেওয়া যে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ এখন বহুমুখী রূপ নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে? ভারত, ইসরায়েল ও গ্রিস নিশ্চিতভাবেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, তবে এই জোট বাস্তবে যুদ্ধের চিত্র বদলে দেবে কি না, তা কেবল সময়ই বলতে পারবে।





























