অতিরিক্ত এআই ব্যবহারে কি মানুষের স্মৃতিশক্তি কমছে, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
- আপডেট সময় : ০১:৩২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে

জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা কিংবা দীর্ঘ লেখার সারাংশ তৈরির মতো নানা দৈনন্দিন কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে সহজে করে নেওয়া যাচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং স্বাধীন চিন্তাভাবনার দক্ষতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থিত গ্লেনিগলস হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. নাইজেল পিটার সিমস জানান, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিয়মিত মানসিক চর্চার মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর পারস্পরিক সংযোগ পরিবর্তিত ও সুদৃঢ় হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’। ফলে শেখা এবং যেকোনো তথ্য মনে রাখার সক্ষমতা পুরোপুরি নির্ভর করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে মস্তিষ্ক কতখানি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে তার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহারের কারণে সরাসরি স্মৃতিশক্তি লোপ পায়—এমন কোনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে নিজস্ব চিন্তা, মনোযোগ ও বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা কাজে না লাগিয়ে প্রতিটি কাজে প্রযুক্তির সাহায্য নিলে শেখার জন্য যে মৌলিক অনুশীলন প্রয়োজন, তা থেকে মস্তিষ্ক বঞ্চিত হয়। কোনো তথ্য দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখার জন্য প্রথমে সেটি গ্রহণ করতে হয়, মস্তিষ্কে সংরক্ষণ করতে হয় এবং সময়মতো তা মনে করতে হয়। নতুন স্মৃতি গঠনে মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন—কোনো অধ্যায়ের মূল কথা পড়ে নেওয়ার চেয়ে বইটি বন্ধ করে নিজের ভাষায় তা মনে করার চেষ্টা করলে মস্তিষ্ককে সংরক্ষিত তথ্য সক্রিয়ভাবে খুঁজে বের করতে হয়। এই বিশেষ চর্চাকে বলা হয় ‘অ্যাক্টিভ রিকল’ বা সক্রিয় স্মৃতিচর্চা।
দীর্ঘ অনুচ্ছেদ সংক্ষেপ করা বা জটিল সমস্যার সম্ভাব্য পথ খুঁজে বের করতে এআই নিঃসন্দেহে বেশ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ প্রযুক্তির হাতে সঁপে দিলে মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রাপ্তবয়স্করা মাত্রাতিরিক্তভাবে এআই-নির্ভর হয়ে উঠলে তাদের স্বাধীন বিচার-বিশ্লেষণ ও তথ্য মনে করার সক্ষমতা শিথিল হতে পারে। একইভাবে শিশুদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এআই দিয়ে দিলে তাদের যুক্তি, গভীর মনোযোগ ও মানসিক দক্ষতার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে এর কারণে মস্তিষ্কের স্থায়ী কোনো শারীরিক ক্ষতি বা স্থায়ী স্মৃতিভ্রংশ ঘটে—এমন সিদ্ধান্তে আসার মতো যথেষ্ট উপাত্ত এখনো নেই।
এআই ব্যবহারের সময় মস্তিষ্কের কাজের ধরন পর্যালোচনা করতে এমআইটি মিডিয়া ল্যাব ‘ইওর ব্রেন অন চ্যাটজিপিটি’ শীর্ষক একটি প্রারম্ভিক গবেষণা পরিচালনা করে। এতে অংশগ্রহণকারীদের প্রবন্ধ লেখার সময় ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি বা ইইজি পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। একদল অংশগ্রহণকারী চ্যাটজিপিটির সহায়তা নেন এবং অন্যদল সম্পূর্ণ নিজ ক্ষমতায় লেখেন। গবেষকরা দেখতে পান, যারা এআই ব্যবহার করেছেন, তাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যকার সার্বিক সংকেত আদান-প্রদান ও সংযোগ তুলনামূলক কম ছিল। তবে এটি প্রাথমিক পর্যায়ের একটি পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট কাজভিত্তিক পর্যবেক্ষণ হওয়ায় এটি দিয়ে এআই স্থায়ীভাবে স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে বলা যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, এআই-কে নিজস্ব চিন্তার বিকল্প না বানিয়ে কেবল শেখার একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। কঠিন বিষয় বুঝতে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার পর তা নিজের ভাষায় প্রকাশ করা, প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করা এবং সমস্যা সমাধানের প্রাথমিক চেষ্টা নিজের মস্তিষ্ক দিয়েই করা উচিত। প্রাত্যহিক মানসিক অনুশীলন অব্যাহত রেখে প্রযুক্তিকে কাজে লাগালেই মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।





























