বাংলাদেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে কেন চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য?
- আপডেট সময় : ১১:০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

ফুটবল, ক্রিকেটের ব্যাট-প্যাড থেকে শুরু করে জিমের আধুনিক ট্রেডমিল কিংবা ব্যাডমিন্টন র্যাকেট—বাংলাদেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে এখন চীনা পণ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য। রাজধানীর গুলিস্তান বা পল্টনের পাইকারি ও খুচরা দোকান থেকে শুরু করে বড় শোরুম এবং পেশাদার প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতেও এখন চীনের তৈরি সামগ্রীই সবচেয়ে বেশি শোভা পাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিশাল এই বাজারের সিংহভাগই এখন আমদানিনির্ভর, যার মূল উৎস চীন।
বাংলাদেশ স্পোর্টস গুডস মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব মতে, দেশে প্রতিবছর ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারের আকার প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্যই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশ আসে চীন থেকে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক সংস্থা দ্য অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি (ওইসি) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে আরও বড় চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার মোট ক্রীড়াসামগ্রীর প্রায় ৮০ শতাংশই চীন থেকে আমদানি করে। শুধু ২০২৪ সালেই চীন থেকে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার ক্রীড়াসামগ্রী আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিম ও ফিটনেস ইকুইপমেন্ট, আধুনিক ট্রেডমিল, ওয়েটলিফটিং বারবেল, হোম জিমসামগ্রী, ফুটবল, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিস র্যাকেট এবং ক্রিকেট গিয়ার।
ক্রীড়াসামগ্রীর পাশাপাশি ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনার সময়েও চীনা জার্সির আধিপত্য থাকে আকাশচুম্বী। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আগের পাঁচ মাসে বিশ্বের ২৪টি দেশ থেকে মোট ২ লাখ ২২ হাজার জার্সি আমদানি করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২ লাখ ১৭ হাজার জার্সিই এসেছে চীন থেকে, যা মোট আমদানির প্রায় ৯৮ শতাংশ। বাজার গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান আইমার্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে ফুটবলের বাজার ছিল ৩৫০ কোটি ডলারের। এই বাজারে নেতৃত্ব দেওয়া বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড যেমন অ্যাডিডাস, পিউমা, নাইকি, ডিক্যাথেলন, ফ্রাঙ্কলিন ও ফরমেটিভ মূলত চীন থেকেই তাদের ফুটবল তৈরি করিয়ে নেয়। ফুটবল উৎপাদনে চীনের পরেই রয়েছে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও জার্মানি।
স্থানীয় বাজারের বিক্রেতারা জানান, দামের সাশ্রয় ও পণ্যের বৈচিত্র্যের কারণেই চীনা ক্রীড়াসামগ্রীর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের টি ওয়ার্ল্ড স্পোর্টসের বিক্রেতা কাউসার হোসেন জানান, আগে ভালো মানের বিদেশি ফুটবল বা টেনিস র্যাকেট সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে ছিল। কিন্তু এখন চীনা পণ্যের কল্যাণে মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে আকর্ষণীয় ডিজাইন ও টেকসই ফুটবল বা গিয়ার পাওয়া যাচ্ছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদকেরা এখনো মূলত সাধারণ মানের ক্রিকেট ব্যাট ও ফুটবলের মতো সীমিত কিছু পণ্য তৈরিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছেন।
বাংলাদেশ স্পোর্টস গুডস মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম আর শামিম জানান, দেশে স্থানীয় উৎপাদনসক্ষমতা মাত্র ৪০ শতাংশের মতো, যা মূলত সাধারণ মানের ক্রিকেট ব্যাট ও ফুটবলেই সীমাবদ্ধ। তিনি বলেন, চীন যদি সাশ্রয়ী মূল্যে এসব আধুনিক ও ডিজিটাল ক্রীড়া সরঞ্জাম সরবরাহ না করত, তবে দেশের ক্রীড়া খাতের আধুনিকায়ন আরও কয়েক দশক পিছিয়ে যেত। চীনের এই সরবরাহ চেইনকে দেশের জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন তিনি। তবে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে চীনের প্রযুক্তি, কাঁচামাল ও উৎপাদন দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে কারখানা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। বিশেষ করে জার্সি, স্পোর্টসওয়্যার, ব্যাগ, গ্লাভস ও কিছু প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম তৈরিতে বাংলাদেশের বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভর বাজারকে উৎপাদনমুখী করার বড় সুযোগ রয়েছে।



























