সন্দেহের বশে কাউকে বাংলাদেশি বলে তাড়ানো যাবে না: কলকাতা হাইকোর্ট
- আপডেট সময় : ১০:১১:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেবল প্রতিবেশীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তিকে সন্দেহের বশে আটকে রাখা এবং বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আদালত। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তির জাতীয়তা নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একটি স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসের (এফআরআরও) জারি করা একটি আদেশ এবং স্বামীর আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন এক নারী। তার আইনজীবী রবিউল ইসলাম আদালতে জানান, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া সন্দেহের জেরে গত ৮ আগস্ট থেকে ওই ব্যক্তিকে আটকে রাখা হয়েছে। শুনানিতে বিচারপতি ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, "সত্তরের দশকে কত মানুষ সীমান্ত পেরিয়েছিলেন? তাদের সবাইকে কি ফেরত পাঠানো সম্ভব?" তিনি আরও মন্তব্য করেন, মাত্র কয়েকজন মানুষের কথার ওপর ভিত্তি করে কীভাবে কারও জাতীয়তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায়? এছাড়া যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে এভাবে আটকে রাখা যায় না বলেও তিনি জানান।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, আটক ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য ও নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রায় দুই মাস ধরে তাকে আটকে রাখার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয়তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ‘স্পষ্ট ও প্রমাণযোগ্য প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করতে হবে। শুনানি চলাকালে রাজ্য সরকারের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার দাবি করেন, আটক ব্যক্তি হয়তো ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে ভোটার আইডি, আধার ও প্যান কার্ডের মতো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছেন। তবে এর সপক্ষে তিনি কোনো তথ্য-প্রমাণ আদালতে পেশ করতে পারেননি।
এমতাবস্থায় বিচারপতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নির্বাসন আদেশের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি মামলাটি পরবর্তী শুনানির জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে ফেরত পাঠিয়েছেন, যাতে এটি উপযুক্ত বেঞ্চে পাঠানো যায়। কলকাতা হাইকোর্টের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি চিহ্নিতকরণ, বহিষ্কার অভিযান এবং নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। ইতোমধ্যেই অনেককে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ ছাড়াই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সহায়তায় এসব মানুষকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে দাবি উঠেছে। বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) এ নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ দায়ের করেছে। সংগঠনটির সম্পাদক জানান, কেবল সন্দেহের বশে ভারতীয় নাগরিকদের আটকে রেখে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যে রাজ্য সরকার ‘আটক, বাদ, বহিষ্কার’ নীতি চালুর ঘোষণা দেয়। এই নীতির আওতায় সন্দেহভাজনদের ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আটকে রেখে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর আগে, গত জুলাইয়ে আদালতের নির্দেশে মালদার মহদীপুর স্থলবন্দর দিয়ে এক নারী ও দুই শিশুসহ চার ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে প্রায় এক বছর কাটানোর পর নিজ দেশে ফিরে আসেন।




























