৪০০ কোটি টাকা বাড়তি খরচেও মানহীন পাঠ্যবই, ৫২ ছাপাখানায় অনিয়ম শনাক্ত
- আপডেট সময় : ০৩:০৪:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বিতরণের পাঠ্যবই ছাপাতে সরকারের খরচ বাড়ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ছাপাখানার মালিকদের দরপত্র, কাগজের চড়া দাম ও মুদ্রণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই বাড়তি খরচ হচ্ছে। তবে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ বাড়তি ব্যয়ের পরও পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে চরম অনিয়ম ও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের ৫২টি ছাপাখানায় নিম্নমানের বই শনাক্ত করা হয়েছে এবং নষ্ট করা হয়েছে এক কোটির বেশি ফর্মা। নিম্নমানের কালি ও কাগজ ব্যবহার, ফর্মা মিসিং ও ডাবল ফর্মা ছাপানোসহ নানা অভিযোগের মুখে পড়েছে বই মুদ্রণের কাজ। এসব অনিয়মে শিথিলতা দেখানোর অভিযোগে বেসরকারি পরিদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সর্বমোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ বই ছাপাতে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। গত বছরের চেয়ে এবার ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৯৪৭টি বই বেশি ছাপানো হচ্ছে। প্রায় ৩১ কোটি বই মুদ্রণের জন্য এনসিটিবির সাথে চুক্তি সম্পন্ন করেছে ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এবার গতবারের চেয়ে মুদ্রণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা এবং প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বেশি দর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে বাড়তি খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। গত শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকে ফর্মা প্রতি ব্যয় ৩ টাকা ৪৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে এবার ৩ টাকা ৫৪ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে মাধ্যমিকে গত বছর ফর্মা প্রতি খরচ ২ টাকা ৩১ পয়সা থাকলেও চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সায়। মাধ্যমিকে বইয়ের সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় ২২ লাখ।
পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ও মূল্যবৃদ্ধির এই প্রভাব সরাসরি বাজেটে পড়লেও মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘মিনিস্ট্রি টিম’, এনসিটিবির ‘পরিদর্শন টিম’ এবং নিয়োজিত পরিদর্শন এজেন্টের সরজমিন তদন্তে নানা ত্রুটি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ফর্মা মিসিং, ডাবল ফর্মা, আলট্রা বার্নিশ না করা, বাঁধাইয়ে ক্রুটি এবং নিম্নমানের কালি ব্যবহারের মতো গুরুতর অনিয়ম রয়েছে। অনেক বইয়ের লেখা ঝাপসা, কাগজ খসখসে এবং কালি লেপ্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কোনো কোনো ছাপাখানা বইয়ের শুরুর কয়েকটি পৃষ্ঠায় ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করলেও ভেতরের পাতাগুলোতে অত্যন্ত নিম্নমানের কাগজ জুড়ে দিয়েছে।
এদিকে কাগজের মান যাচাই করা নিয়ে প্রেস মালিক ও পরিদর্শন এজেন্টের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। প্রেস মালিকদের একাংশের দাবি, দেশের নামকরা পেপার মিলের ভালো মানের কাগজও পরিদর্শন এজেন্ট আটকে দিচ্ছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু ভেন্ডর থেকে কাগজ কিনলে তা সহজেই পাস করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, কাগজ আটকে রেখে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ভেন্ডরের কাছ থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে প্রেস মালিকদের। এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ভালো মানের কাগজের দাম টনপ্রতি ১ লাখ ১৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৭০ শতাংশ ভার্জিন পাল্প ও ৩০ শতাংশ রিসাইকেলড পাল্প দিয়ে তৈরি কাগজ টনপ্রতি প্রায় ৯০ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ১০০ কোটি টাকার বইয়ের কাজ পায়, তবে তাদের প্রায় ৫ হাজার টন কাগজের প্রয়োজন হয়। কাগজের মান এভাবে কমিয়ে দিলে শুধু কাগজ কেনাতেই প্রায় ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় বা পার্থক্য তৈরি করা সম্ভব।
নির্ধারিত মানের চেয়ে কম জিএমএস-এর কাগজ ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ‘ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডি’ নামের প্রতিষ্ঠানটিকে শোকজ করেছে এনসিটিবি। প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপার কাজে তাদের প্রতিনিধিদের দায়িত্বে অবহেলা ও চুক্তির শর্তভঙ্গের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা কার্যাদেশ বাতিল করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে পরিদর্শন এজেন্টের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, কাগজের একেক রোলের মান একেক রকম হওয়ায় তারা প্রতিটি রোল পরীক্ষা করছেন। ১০০ রোলের মধ্যে ৬০টি মানসম্মত হলে কাজ সচল রাখার স্বার্থে সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে একজন প্রেস মালিক জানান, সব প্রতিষ্ঠানের কাজ খারাপ হচ্ছে না। প্রতি বছরই কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের কাজ করেও পার পেয়ে যায়। শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে তারা নিম্নমানের বই গছিয়ে দেয়, যার দায় এসে পড়ে পুরো খাতের ওপর। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর মাধ্যমিকের পরিদর্শন এজেন্টকে শোকজ করা হয়েছে এবং অন্য এজেন্টদেরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বইয়ের মানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না এবং শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো মানসম্মত বই পৌঁছে দিতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।


























