ঢাকা ০৪:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কাটলে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করবে সরকার মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষার্থীদের প্রতি ডেপুটি স্পিকারের আহ্বান আবু ইয়াকুব ইউসুফ আল-কুমি: ইবন আরাবির বর্ণনায় এক সুফি সাধক সোনারগাঁয়ে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার ১২ ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহে ট্যাব ও প্রশিক্ষণ শুরু সমাজসেবা অধিদপ্তরের জাতিসংঘে আজ প্রথম ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান না ফেরার দেশে প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন বঙ্গভবনের সিংহ পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন প্রেসিডেন্ট বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমল, কারণ জানাল রয়টার্স টেকসই উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির আহ্বান ববি হাজ্জাজের

পতাকা বদলালেও বদলায়নি ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো ও মানসিকতা

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৮:২৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ১৯৪৭ সাল ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সিরিল র‍্যাডক্লিফের টানা সীমারেখার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই নতুন দেশগুলোতে ‘আজাদি’ বা স্বাধীনতার শ্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেই আজাদি কি সত্যিই এসেছিল, নাকি ব্রিটিশ শাসকের কাছ থেকে কেবল দেশীয় অভিজাতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল? ১৯৪৭ সালের উত্তরাধিকার বিচার করতে হলে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আনা জরুরি। কারণ পতাকা বদলালেই আজাদি আসে না; আজাদি তখনই অর্থবহ হয়, যখন জনগণ নিজেদের শাসন করতে পারে। কোনো জাতিই শোষক বা উপনিবেশবাদীর সঙ্গে টেবিলে বসে প্রকৃত আজাদি অর্জন করতে পারেনি।

১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ত্বরান্বিত হয়। রাষ্ট্র নতুন হলেও ব্রিটিশদের নির্মিত ঔপনিবেশিক কাঠামো—আইন, আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো অক্ষত রয়ে যায়। ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র ও রাজনীতি বদলালেও উপনিবেশবাদের মূল কাঠামো রয়ে গেছে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ নিয়ে আলোচনা করলে তা সহজে শেষ করা সম্ভব নয়, তবে পুলিশ সার্ভিস নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন, কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ সার্ভিসের আইনি ভিত্তি মূলত ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন। পাকিস্তান ও ভারতে এর সংস্কার হলেও বাংলাদেশে এই আইন এখনো কার্যকর। ব্রিটিশরা যখন এই আইন প্রণয়ন করেছিল, তখন তাদের চোখে শাসিত জনগোষ্ঠী ছিল অধীনস্থ ও উপনিবেশিত। ফলে এই আইন জনগণের সেবা বা নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এই আইন ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর কারণে সমালোচিত। জনকল্যাণমূলক পুলিশিংয়ের পরিবর্তে এতে আনুগত্য, শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইনটির ৩ নম্বর ধারায় পুলিশের ওপর সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্বাহী কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে ১২ নম্বর ধারায় মহাপরিদর্শককে সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষে পুলিশ বাহিনীর সংগঠন, দায়িত্ব, পরিচালনা ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই কাঠামো অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত, দমনমূলক এবং জবাবদিহিতার দিক থেকে দুর্বল।

আমাদের পুলিশের নির্দয় ও কর্তৃত্ববাদী আচরণকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারা তাদের আইনি ভিত্তি অনুযায়ী ‘সঠিক’ কাজই করে যাচ্ছে। তারা এমন এক ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর অধীনে কাজ করে, যেখানে জনগণকে নাগরিকের বদলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রজা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। একই উত্তরাধিকার আমাদের আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাতেও বিদ্যমান। ব্রিটিশ শাসন থেকে আজাদির পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করেছিল। বিপরীতে উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান ও শাসনপদ্ধতির মৌলিক কাঠামো বহাল রেখেই নিজেদের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ওয়েস্টমিনস্টার মডেলকে গ্রহণ করেছে। ফলে তৈরি হয়েছে একশ্রেণির ‘কালো ইংরেজ’—যাদের চিন্তা, প্রতিষ্ঠান ও শাসনদৃষ্টি সম্পূর্ণ ইংরেজ। রাষ্ট্রশিল্প বা statecraft নিয়ে ভাবতে হলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো রাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ওয়েস্টমিনস্টার মডেল এবং ঔপনিবেশিক আইনকানুনের ওপর ভর করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করে চলেছে। ফলে শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ বদলালেও তার ভেতরের ঔপনিবেশিক যুক্তি অটুট রয়ে গেছে।

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৬আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৭

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

পতাকা বদলালেও বদলায়নি ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো ও মানসিকতা

আপডেট সময় : ০৮:২৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ১৯৪৭ সাল ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সিরিল র‍্যাডক্লিফের টানা সীমারেখার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই নতুন দেশগুলোতে ‘আজাদি’ বা স্বাধীনতার শ্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেই আজাদি কি সত্যিই এসেছিল, নাকি ব্রিটিশ শাসকের কাছ থেকে কেবল দেশীয় অভিজাতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল? ১৯৪৭ সালের উত্তরাধিকার বিচার করতে হলে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আনা জরুরি। কারণ পতাকা বদলালেই আজাদি আসে না; আজাদি তখনই অর্থবহ হয়, যখন জনগণ নিজেদের শাসন করতে পারে। কোনো জাতিই শোষক বা উপনিবেশবাদীর সঙ্গে টেবিলে বসে প্রকৃত আজাদি অর্জন করতে পারেনি।

১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ত্বরান্বিত হয়। রাষ্ট্র নতুন হলেও ব্রিটিশদের নির্মিত ঔপনিবেশিক কাঠামো—আইন, আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো অক্ষত রয়ে যায়। ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র ও রাজনীতি বদলালেও উপনিবেশবাদের মূল কাঠামো রয়ে গেছে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ নিয়ে আলোচনা করলে তা সহজে শেষ করা সম্ভব নয়, তবে পুলিশ সার্ভিস নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন, কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ সার্ভিসের আইনি ভিত্তি মূলত ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন। পাকিস্তান ও ভারতে এর সংস্কার হলেও বাংলাদেশে এই আইন এখনো কার্যকর। ব্রিটিশরা যখন এই আইন প্রণয়ন করেছিল, তখন তাদের চোখে শাসিত জনগোষ্ঠী ছিল অধীনস্থ ও উপনিবেশিত। ফলে এই আইন জনগণের সেবা বা নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এই আইন ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর কারণে সমালোচিত। জনকল্যাণমূলক পুলিশিংয়ের পরিবর্তে এতে আনুগত্য, শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইনটির ৩ নম্বর ধারায় পুলিশের ওপর সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্বাহী কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে ১২ নম্বর ধারায় মহাপরিদর্শককে সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষে পুলিশ বাহিনীর সংগঠন, দায়িত্ব, পরিচালনা ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই কাঠামো অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত, দমনমূলক এবং জবাবদিহিতার দিক থেকে দুর্বল।

আমাদের পুলিশের নির্দয় ও কর্তৃত্ববাদী আচরণকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারা তাদের আইনি ভিত্তি অনুযায়ী ‘সঠিক’ কাজই করে যাচ্ছে। তারা এমন এক ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর অধীনে কাজ করে, যেখানে জনগণকে নাগরিকের বদলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রজা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। একই উত্তরাধিকার আমাদের আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাতেও বিদ্যমান। ব্রিটিশ শাসন থেকে আজাদির পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করেছিল। বিপরীতে উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান ও শাসনপদ্ধতির মৌলিক কাঠামো বহাল রেখেই নিজেদের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ওয়েস্টমিনস্টার মডেলকে গ্রহণ করেছে। ফলে তৈরি হয়েছে একশ্রেণির ‘কালো ইংরেজ’—যাদের চিন্তা, প্রতিষ্ঠান ও শাসনদৃষ্টি সম্পূর্ণ ইংরেজ। রাষ্ট্রশিল্প বা statecraft নিয়ে ভাবতে হলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো রাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ওয়েস্টমিনস্টার মডেল এবং ঔপনিবেশিক আইনকানুনের ওপর ভর করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করে চলেছে। ফলে শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ বদলালেও তার ভেতরের ঔপনিবেশিক যুক্তি অটুট রয়ে গেছে।

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৬আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৭

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh