ইরানের চেয়ে ইসরাইলই জর্ডানের জন্য বড় হুমকি
- আপডেট সময় : ০৮:১৬:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

জর্ডানের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের প্রায় ৩০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উড়ে যাওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তীতে দেশটির মার্কিন ঘাঁটিতে সেগুলোর আঘাত হানার বিষয়টি পশ্চিমা গণমাধ্যমে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে গত জুলাইয়ে এক হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর জর্ডানের শতাধিক সামাজিক কর্মী দেশে মার্কিন সেনা উপস্থিতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন এবং তাদের দেশ ছাড়ার দাবি জানান। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা জর্ডানের এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, দেশটির নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিষয়। ইরানের চেয়েও ইসরাইলকে তারা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন।
জর্ডানের সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল যদি পশ্চিমতীর গ্রাস করে নেয়, তবে জর্ডানের অস্তিত্বই চিরতরে বিপন্ন হবে। এই আশঙ্কার নাম দেওয়া হয়েছে ‘আল-ওয়াতান আল-বাদিল’ বা বিকল্প জন্মভূমি। আম্মানের আশঙ্কা, ইসরাইল পশ্চিমতীর দখল করে ফিলিস্তিনিদের জর্ডানে চলে যেতে বাধ্য করবে, যা দেশটির জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। অসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমতীরের তিন ভাগের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে থাকা ‘সি’ অঞ্চলে এখন ইসরাইল ব্যাপক বসতি স্থাপন করছে। ইসরাইল যদি শুধু এই ‘সি’ অঞ্চল ও পূর্ব জেরুসালেমও দখল করে, তাহলেও অন্তত পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি জর্ডানে প্রবেশ করতে বাধ্য হবে। আর যদি সম্পূর্ণ পশ্চিমতীর দখল করা হয়, তবে ফিলিস্তিনিদের এক বিশাল গণহিজরত শুরু হবে, যা জর্ডানের স্থিতিশীলতা ধূলিসাৎ করে দেবে।
২০০০ সালের পর থেকে জর্ডান একের পর এক সংকট মোকাবিলা করে টিকে রয়েছে। ইরাক ও সিরিয়ার লাখ লাখ শরণার্থীর চাপ সামলানো, আরব বসন্তের ধাক্কা, বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্রের ছায়া এবং সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে মাদকের চোরাচালান সামলেও শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ভর করে রাজতন্ত্র একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেছে। এই স্থিতিশীলতার কারণেই জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার প্রধান ঢাল এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের রসদ সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। জর্ডানে ডজনখানেক মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে এবং চলতি বছরই তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পেয়েছে।
১৯৯৪ সালের শান্তি চুক্তির পর জর্ডান ও ইসরাইলের সম্পর্ক এখন গাজা যুদ্ধ এবং লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের কারণে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইসরাইলের দিকে ধেয়ে আসা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে জর্ডান মার্কিন মধ্যস্থতায় সাহায্য করেছিল, তবুও তারা নিজেদের রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে নিয়েছে এবং জ্বালানি চুক্তি বাতিল করেছে। বাদশাহ আবদুল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, পশ্চিমতীর দখল করার চেষ্টা করা হলে জর্ডান তা মেনে নেবে না এবং প্রয়োজনে ১৯৯৪ সালের শান্তি চুক্তি বাতিল করা হতে পারে।
পশ্চিমতীর দখল হয়ে গেলে জর্ডানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ফাটলগুলো আরও চওড়া হবে। জর্ডানের মূল জাতীয়তাবাদীরা সবসময়ই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের সন্দেহের চোখে দেখে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূতরা রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছে। এতকাল ধরে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নই এই দুই পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব ভুলিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুছে গেলে জর্ডানের ভেতরে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হবে। মূল জর্ডানিরা রাজনৈতিক আধিপত্য হারানোর ভয়ে থাকবে, আর নতুন আসা শরণার্থীরা নাগরিক অধিকারের দাবিতে রাজপথে নামবে।
এই বিশাল শরণার্থী সংকট জর্ডানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে, যেখানে বর্তমানে সরকারি ঋণ ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছে এবং তরুণদের বেকারত্ব আকাশছোঁয়া। এছাড়া জেরুসালেমের পবিত্র স্থানগুলোর রক্ষক হিসেবে জর্ডান রাজপরিবারের যে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তাও হুমকিতে পড়বে। জর্ডানের দীর্ঘ ও দুর্গম পাহাড়ি ৬০ মাইলের সীমান্ত পুরোপুরি সিল করা জর্ডান সেনাবাহিনীর পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া রাজধানী আম্মান সীমান্ত থেকে মাত্র ২০ মাইল দূরে অবস্থিত হওয়ায় একবার ফিলিস্তিনিরা ঢুকে পড়লে তাদের ফেরত পাঠানো অসম্ভব হবে।
এদিকে ইসরাইলের কাছে জর্ডানের কৌশলগত গুরুত্ব বা 'বাফার স্টেট' হিসেবে প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর শক্তি হ্রাস পাওয়া, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং ইরানের ওপর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপের কারণে ইসরাইল এখন অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত। ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকোর্ডের মাধ্যমে অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ায় ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থিদের কাছে এখন পশ্চিমতীর দখল করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। জর্ডানের মানুষের ভয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুখে বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইসরাইলের পক্ষই নেবে। ফলে জর্ডানকে একাই এই অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।



























