নাইন ইলেভেন যেভাবে বদলে দিল মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক
- আপডেট সময় : ০৪:৫১:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াবহ হামলার পর আড়াই দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ‘নাইন ইলেভেন’ নামে পরিচিত এই ঘটনা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা পররাষ্ট্রনীতিতেই পরিবর্তন আনেনি, বরং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে তৈরি করেছে এক দীর্ঘস্থায়ী ফাটল। একই সঙ্গে মার্কিন সীমানার ভেতরেও মুসলিমদের জীবনযাত্রায় যোগ করেছে এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট।
সেদিন নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে মাত্র ১৭ মিনিটের ব্যবধানে দুটি বিমান আঘাত হানে। একই দিনে আরও দুটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করে পেন্টাগন ও পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত করা হয়। এই নজিরবিহীন হামলায় প্রাণ হারান প্রায় তিন হাজার মানুষ। হামলার পরপরই এর পেছনে ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-কায়েদা এবং এর প্রধান ওسامা বিন লাদেনের হাত রয়েছে বলে দাবি করে ওয়াশিংটন। এরপরই ২০ সেপ্টেম্বর মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বিশ্বজুড়ে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বা ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণা করেন। সেই ভাষণে তিনি বিশ্বনেতাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো তাদের সঙ্গে।’
এই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় ওই বছরেরই ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। মূলত ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তরের মার্কিন প্রস্তাব তালেবান সরকার প্রত্যাখ্যান করার পর এই হামলা চালানো হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ কেবল আফগানিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। এরপর ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপেও অংশ নেয় ওয়াশিংটন। আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযানের ফলে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘদিনের নীতি নিয়ে থাকা অসন্তোষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। যার জেরে পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, মিশর ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে বড় ধরনের মার্কিনবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে, তাদের এই লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ এই ব্যাখ্যায় কখনো আস্থা রাখতে পারেনি। এই সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বসবাসরত মুসলিমদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল অত্যন্ত তীব্রভাবে। হামলার পর দেশটিতে মুসলিমদের নিশানা করে ঘৃণাজনিত অপরাধ বা হেইট ক্রাইম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাজনিত অপরাধের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৮টি, সেখানে ২০০১ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী দিনগুলোতে। পরবর্তী বছরগুলোতেও এই বিদ্বেষমূলক হামলা পুরোপুরি কমেনি। এমনকি ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো বছরেই এই ধরনের অপরাধের সংখ্যা ১০০-এর নিচে নামেনি। আড়াই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নাইন ইলেভেনের সেই political ও সামাজিক অভিঘাত আজও মার্কিন সমাজে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।


























