ভুল নকশায় ৩ হাজার কোটি টাকা গচ্চা, বিআরটি নিয়ে বিপাকে সরকার
- আপডেট সময় : ০৯:০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে

টানা ১৩ বছর ধরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করার পর সরকার জানতে পেরেছে যে গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের নকশায় মারাত্মক সব ত্রুটি রয়েছে। ২০২৬ (2026) সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভুল পরিকল্পনা, ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার এই চিত্রটি উঠে এসেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) জ্যেষ্ঠ শিক্ষক এবং সড়ক ও মহাসড়ক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি প্রকল্পটিকে নতুন করে এক্সপ্রেস হাইওয়েতে রূপ দেওয়া অথবা কিছু অবকাঠামো ভেঙে সার্ভিস লেনসহ টোল সড়কে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিআরটি প্রকল্পের ব্যবহারের অযোগ্য কাঠামো ভাঙতেই খরচ হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। আর এটিকে হাইওয়েতে রূপান্তর করতে অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি পিএলসি (ঢাকা বিআরটি পিএলসি) বিলুপ্ত করার পরিকল্পনাও করছে মন্ত্রণালয়। এটি বাতিল করে প্রকল্পটিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে নিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই চালানো হতে পারে। প্রকল্পের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
সড়ক ও জনপথ বিশেষজ্ঞরা পলাতক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ইচ্ছায় নেওয়া এই প্রকল্পটিকে একটি বড় ধরনের ‘ভজঘট’ হিসেবে দেখছেন। অনেকে এটিকে জনগণের অর্থের অপচয় ও মেগা দুর্নীতির বড় উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, প্রকল্পটিতে শুধু কারিগরি ও প্রকৌশলগত ত্রুটিই নেই, এটি দেশবাসীর সঙ্গে একটি বড় প্রতারণা। বিশেষ কমিটি এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরাও প্রকল্পটিকে ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এটি এমনভাবে বিঁধেছে যে ফেলাও যাচ্ছে না, আবার গেলাও যাচ্ছে না। মন্ত্রিসভায় আলোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
অথচ শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানির ওয়েবসাইটে এই প্রকল্পটিকে হাসিনা সরকারের উন্নয়ন ও রূপকল্পের অনন্য নজির হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান ও হাসিনার ছবিসংবলিত ৬২ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই রুটটি যাতায়াতকারীদের জন্য অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে। গাজীপুর থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ডেডিকেটেড লেনে পিক আওয়ারে প্রতি ৩০ সেকেন্ড পরপর স্ট্যান্ডার্ড এসি বাস চলাচল করবে। এছাড়া স্টেশনগুলোয় ই-টিকিটিং, স্বয়ংক্রিয় টিকিট কাউন্টার এবং ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের (আইটিএস) ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছিল প্রতিবেদনে।
বাস্তবে এই প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি ইন্টারন্যাশনাল ও ব্রিসবেন সিটি এন্টারপ্রাইজ, ফ্রান্সের সিস্ট্রা এসএ এবং বাংলাদেশের এসিই কনসালট্যান্স লিমিটেড। এছাড়া করিডোর পরিচালনা ও ব্যবসায়িক মডেল তৈরিতে যৌথভাবে যুক্ত ছিল ভারতের সিইপিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি)। তবে পরবর্তীতে সিইপিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট এই প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। শুরু থেকেই সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটি কোম্পানির মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন ছিল। কোম্পানিটি স্বাধীনভাবে কাজ করায় এবং ভুল নকশার কারণে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্বাচনি চমক হিসেবে নেওয়া এই আত্মঘাতী প্রকল্পটির কাজ চলাকালে একাধিকবার প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই ‘অদ্ভুত প্রকল্প’ স্থগিত করার পর, রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় ও তছরুপের দায়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়েরের সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এই প্রকল্পের নকশা অত্যন্ত অসংগতিপূর্ণ। ফুটপাতে চলন্ত সিঁড়ি (এসকেলেটর) ও লিফট স্থাপন করা হয়েছে, যার কারণে পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন অদ্ভুত প্রকল্প বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই।
প্রকল্পের এক সাবেক পরামর্শক ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ জানান, যুক্ত হওয়ার পর এটিকে কোনো জনকল্যাণমুখী প্রকল্প মনে হয়নি, বরং লুটপাটের প্রকল্প মনে হওয়ায় তারা সরে যান। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের সব গাড়ির দরজা বাম দিকে থাকে এবং চালকরা বাম দিক দিয়েই গাড়ি চালান। অথচ বিআরটি প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত বাস ও চালকদের চলাচল ডান দিকে নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের নকশা নকল করে তৈরি করা হয়েছে, যা এ দেশের বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত।
প্রকল্পের নির্মাণকাজ চারটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে তিনটি চীনা কোম্পানি (গেজহুবা গ্রুপ, জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ ও ওয়েহেই ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেটিভ) এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান সেল-ইউডিসিকে দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক বাজেট ২,০৪০ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ৪,২৬৮ কোটি টাকা করা হয়। সবশেষ ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ব্যয় বাড়িয়ে ৬,৫৯৭ কোটি টাকা এবং মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে দেয়। এখন পর্যন্ত হাসিনা সরকার ৩,০০০ কোটি টাকার মতো ছাড় করেছে, যা পুরোপুরি শেষ। প্রকল্প বাতিল করে সংস্কার করতে গেলে আরও ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লাগবে, আর পুরোপুরি ভেঙে আগের অবস্থায় নিতে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি লাগবে। ফলে সরকারকে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হকের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি ইতোমধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করেছে। ড. শামছুল হক জানান, প্রকল্পটির সমীক্ষা সঠিকভাবে হয়নি এবং এটি অনুমোদন করাই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তবে এটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলাও ভুল হবে। ঝুঁকি বিবেচনা করে এটিকে এখন দ্বিতলবিশিষ্ট এক্সপ্রেস হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত হবে। বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন হাসানও বলেন, দীর্ঘ বিলম্ব, সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আবদুল্লাহপুর, ভোগড়া ও গাজীপুর মোড়ে ভবিষ্যতের অন্যান্য পরিবহন উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট করা হয়েছে। এখন বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে এটিকে চলাচলের উপযোগী করতে হবে।
বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল করছে। ৮-১০ বছর আগের মসৃণ সড়কটি এখন কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু হয়ে আছে। প্রকল্পের তৈরি করা ১৫টি স্টেশনের অবস্থা এখন ভুতুড়ে। চলন্ত সিঁড়ির খাঁচাগুলো পড়ে থাকলেও ভেতরের মূল্যবান যন্ত্রপাতি টোকাইদের মাধ্যমে ভাঙারি দোকানে চলে গেছে। খোঁড়াখুঁড়ি ও দুর্ঘটনার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিআরটি প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত করে সড়কটি সাধারণ যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি সাধারণ সড়ক হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিআরটি প্রকল্পের পরিচালক।
ভুল পরিকল্পনা ও ত্রুটিপূর্ণ নকশায় রাষ্ট্রের এই বিপুল অর্থ অপচয়ের দায় নিতে চাচ্ছে না কেউ। ঢাকা বিআরটি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মু. নুরুল আমিন খান এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। আর পিডি জানান, তারা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। বিগত সরকারের এই মেগা প্রকল্প নিয়ে বর্তমান সরকারের ভাবনা জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, একটি কমিটি প্রকল্পের অনিয়ম ও ভুলভ্রান্তি নিয়ে কাজ করেছে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যা কল্যাণকর, সরকার সেটাই করবে।



























