জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি ও আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ১২:৪০:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

‘আবার আসিব ফিরে’— জীবনানন্দ দাশের এই বিখ্যাত কবিতাটি অনেকেরই পড়া বা জানা। কবিতাটি শুনলেই মনে হয় কবি ধানসিঁড়ি নদীর তীরে ফিরে আসার কথা বলেছেন। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কবিতার পঙ্ক্তিতে ‘নদী’ শব্দটি নেই। কবি লিখেছেন, ‘আবার আসিবো ফিরে এই ধানসিঁড়িটির তীরে’। আমরা অনেকেই পড়ার সময় ভুল করে ‘ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে’ পড়ে ফেলি। কবি কি আসলেই কোনো নদীর কথা বলেছেন? আমরা সাধারণত নদীকে ‘নদীটি’ বা ‘নদীটা’ বলে সম্বোধন করি না, যেমনটা বুড়িগঙ্গা বা মেঘনার ক্ষেত্রে করি না। তাহলে ধানসিঁড়িটির তীরে বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? কাককে তিনি সুদর্শন বলেছেন, আর কাক কি নদীতে থাকে কিংবা নদীর পাড়ে উড়ে বেড়ায়? আমার তো মনে হয় না।
জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টি ছিল ভিন্ন। তিনি বাংলাকে দেখেছেন রূপসী হিসেবে। ধানসিঁড়ি নামে বাংলাদেশে নদী থাকলেও, কবি হয়তো ধানক্ষেতের ঢেউকেই ধানসিঁড়ি হিসেবে কল্পনা করেছেন। বাতাসে ধানগাছের দোল খাওয়া ঢেউগুলো সিঁড়ির মতো মনে হয়। সেখানে কাক বা শঙ্খচিল উড়ে বেড়ায়। মূলত ধানসিঁড়ি নদী নিয়ে এই লেখাটি কেবল একটি বিশ্লেষণ নয়, বরং এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা কাব্যময়তা ও রহস্যের অনুসন্ধান।
বাংলাদেশ ধানের দেশ, গানের দেশ। সুজলা-সুফলা এই রূপময় বাংলাদেশের চারদিকে ছড়িয়ে আছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র ও কপোতাক্ষসহ হাজারো নদী। মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রবাসে বসে তার প্রিয় কপোতাক্ষ নদকে যেভাবে মিস করেছেন, জীবনানন্দ দাশও তেমনি তার প্রিয় জন্মভূমিকে ভালোবেসেছেন। এই আকুতি শুধু কবির একার নয়, এটি আমাদের সকলের অন্তরাত্মার কথা। আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, বারবার সেই শেকড়ের কাছেই ফিরে আসতে চাই।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, করোনাকালীন সময়ে আমেরিকায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করার সময় আমি আমার মা, বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনকে হারিয়েছি। বৈশ্বিক মহামারির কারণে দেশে আসা সম্ভব না হলেও, আমার মনটা সবসময় দেশেই পড়েছিল। শিশিরভেজা ঘাস, কোকিলের কুহু সুর, পাখির ডাক আর বর্ষার ভরা নদীর স্মৃতি আমাকে বারবার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেত।
আমাদের ছেলেবেলার সেই আনন্দময় দিনগুলো এখনকার প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতার কাছে রূপকথার মতো। ডাংগুলি, চিবুড়ি, দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট বা কানামাছির মতো গ্রামীণ খেলাধুলা এখনকার শিশুরা ভুলতে বসেছে। কবি সুফিয়া কামালের ‘আজিকার শিশু’ কবিতার মতো, এখনকার শিশুরা উত্তর মেরু-দক্ষিণ মেরুর খবর জানলেও, আমাদের সময়ের সেই ঝিমধরা লাটিমের গল্প তাদের কাছে অজানা। তবে যুগের পরিবর্তন হলেও, শিশুদের ভেতরে দেশের প্রতি নির্মোহ টান রয়েছে। ধানসিঁড়ি মানে কেবল একটি নদী নয়, ধানসিঁড়ি মানে বাংলার নদ-নদী, খাল-বিল, মানুষ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যময় বাংলাদেশ। বুকের ভেতর এই মানচিত্রই আঁকা, আর তাই যত দূরেই যাই, বারবার ফিরে আসি এই ধানসিঁড়িটির তীরে। কারণ, ধানসিঁড়িই তো আমাদের বাংলাদেশ।




























