মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০৯:১৩:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা সম্ভব হতো। তবে বর্তমানে এই দর বেড়ে ২৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে আগে যেখানে প্রতি কার্গো এলএনজি আমদানিতে ৪১০ থেকে ৪৯০ কোটি টাকা লাগত, এখন তা কিনতে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, হরমুজ প্রণালিতে যদি স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল দ্রুত শুরু না হয়, তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই সরকারের মোট ব্যয় ৯০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই তীব্র সংকটের মধ্যে সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য থেকে বাড়তি দামে আরও দুই কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ২৪ আগস্ট সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪.৬২৫ ডলার দরে এক কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের কোম্পানি টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে ২৪.২৫ ডলার দরে কেনা হচ্ছে আরও এক কার্গো এলএনজি। এই দুই কার্গোর প্রতিটিতে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে দেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে আগস্টের শুরুতে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে ২১.৫৫ ডলার এবং বিপি সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে ২১.৮৭৮ ও ২১.৭৭৮ ডলার দরে মোট তিন কার্গো এবং ১৯ আগস্ট আরামকো ট্রেডিং থেকে ২৩.৯৩ ডলার দরে আরও এক কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ প্রথম এলএনজি আমদানি শুরু করে ২০১৮ সালে, যার আগে দেশের উৎপাদিত গ্যাস দিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। বিগত বছরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১৮,৮১৩ কোটি টাকা, যেখানে সরকারের ভর্তুকি ছিল ২,৫০০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪০ কার্গো আমদানিতে ২০,০০০ কোটি টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় ৩৯ কার্গো আমদানিতেই দ্বিগুণ তথা ৪০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৪ কার্গো আমদানিতে ৪০,৫৬৩ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৯ কার্গোয় ৩৫,২৭৪ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪০ কার্গো আমদানিতে ৪২,৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৮৬ কার্গোতে পৌঁছায় এবং এতে ব্যয় হয় ৪০,৭৫২ কোটি টাকা। সর্বশেষ বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০৯ থেকে ১১৩ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ৫৯,৭১৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যেখানে সরকারের ভর্তুকি লেগেছে ১৬,৬০০ কোটি টাকা।
২০২৬ সালের বার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে মোট ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ১৭,৩৪৫ কোটি টাকা এবং এলএনজি আমদানির প্রাথমিক ভর্তুকি বাবদ ৬,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্থবছরের প্রথম দেড় মাসেই বার্ষিক ভর্তুকি বরাদ্দের ৪৩ শতাংশ অর্থ শেষ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রধান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি 'অনিবার্য পরিস্থিতি' (ফোর্স মেজার) ঘোষণা করে তাদের সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কাতার থেকে ৮টি কার্গো এলেও চুক্তি ব্যাহত হওয়ায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে শুধু আগস্ট মাসেই ৯টি কার্গো আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৪০ থেকে ৫০টির মতো এলএনজি কার্গো এসে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানান, চলতি অর্থবছরে ১১৫ কার্গো আমদানির লক্ষ্য থাকলেও ভাসমান টার্মিনালগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে না পারায় প্রকৃত আমদানি কিছুটা কম হতে পারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে এবং এলএনজি আমদানির জন্য সরকার ইতোমধ্যে ১৪,৯০০ কোটি টাকা দিয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় তহবিল ছাড় করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে দেশের এই জ্বালানি সংকটকে বিগত সরকারের ভুল নীতির ফসল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, গত ১৭ বছরে জ্বালানি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে। নিজস্ব কূপ থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস উত্তোলন করা হলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে এলএনজি আমদানি করতে হতো না। দেশের মাটির নিচে প্রচুর তেল-গ্যাস থাকলেও বিদায়ী সরকার অনুসন্ধান ও উত্তোলনে মনোযোগ না দিয়ে আমদানিতে ব্যস্ত ছিল। তিনি পরামর্শ দেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সমতলে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগিয়ে এবং গভীর সমুদ্রে অভিজ্ঞ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এখনই তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন জোরদার করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণের বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে স্পট মার্কেট থেকে সরকার প্রতি মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি ১০-১২ ডলারে কিনত। কিন্তু বর্তমানে কিনতে হচ্ছে ২৪ ডলারেরও বেশি দরে। ফলে ৪১০-৪৯০ কোটি টাকার প্রতি কার্গো এলএনজির দাম এখন পড়ছে হাজার কোটি টাকার ওপরে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় শীর্ষ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রায় অর্ধেক সরবরাহ কমিয়ে দেয় । জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কাতার থেকে আটটি কার্গো এসেছিল। এরপর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ব্যাহত হওয়ায় সরকার স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে কার্গো কেনা শুরু করে। যেমন—চলতি আগস্ট মাসেই গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ৯টি কার্গো আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বছরের প্রথম আট মাসে ৪০-৫০টির মতো এলএনজিভর্তি কার্গো দেশে এসে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।



























