শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট
- আপডেট সময় : ১২:১৩:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডির একক সিদ্ধান্তে শিক্ষক বরখাস্ত বা অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রায়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ। এছাড়া, আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে গভর্নিং বডির সভাপতির টেলিফোনিক নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠনকেও আদালত আইনবহির্ভূত বলে অভিহিত করেছে।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরের বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে করা রিট আবেদন খারিজের সময় গত ৯ জুলাই এই রায় দেওয়া হয়। গত রোববার এর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। মামলায় রিট আবেদনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কামরুজ্জামান এবং শিক্ষকের পক্ষে জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও সুলতান মাহমুদ বান্না।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগমের বাড়িতে গিয়ে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে অধ্যাপক আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ নভেম্বর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। জবাবে অভিযোগ অস্বীকার করলে গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটি ওই সিদ্ধান্ত নামঞ্জুর করে শিক্ষককে বকেয়া বেতনসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে গভর্নিং বডির সভাপতি হাইকোর্টে রিট করলে আদালত তা খারিজ করে দেয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, স্বীকৃত বেসরকারি কলেজের শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অসদাচরণের অভিযোগে লিখিত নোটিশ দিয়ে ব্যাখ্যার জন্য কমপক্ষে সাত দিন সময় দিতে হবে এবং ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ রাখতে হবে। তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে গভর্নিং বডির সভায় আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের মাধ্যমে, যেখানে সভাপতির টেলিফোনিক নির্দেশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালত মামলার নথিতে ঘটনার তারিখ নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতিও পেয়েছে। মূল অভিযোগে ৯ নভেম্বর উল্লেখ থাকলেও নোটিশে ৭ নভেম্বর এবং তদন্ত প্রতিবেদনে ৫ ডিসেম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সাত দিনের বদলে ছয় দিন সময় দেওয়া হয়েছিল, যা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। আদালত জানিয়েছে, গভর্নিং বডি কেবল বরখাস্তের প্রস্তাব দিতে পারে, কিন্তু বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া তা কার্যকর করা যায় না। বোর্ডের অনুমোদনকে কোনোভাবেই ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রায়ে শিক্ষক আবুল মনসুরের ক্ষেত্রে বোর্ডের সিদ্ধান্তটি আইনসম্মত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলা চলাকালীন শিক্ষক অবসরের বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাকে স্বপদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে আদালত জানিয়েছে। তবে তিনি অবসরের বয়স পর্যন্ত বকেয়া বেতন, চাকরিসংক্রান্ত সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন বলে রায়ে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয় নোটিশ দেওয়া হয় এবং ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে পাঠানো হলে ২০ এপ্রিলের সভায় তা নামঞ্জুর করে ওই শিক্ষককে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।



























